সমুদ্রে ভেসে অভিবাসনপ্রত্যাশী
ইউরোপের পথে নিখোঁজ স্বপ্ন
- গত ২ মাসে আইওএমের মাধ্যমে ফিরেছেন সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ৯৫ জন
- তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জেরই ৬৬ জন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইউরোপে একটি ভালো জীবনের স্বপ্ন ছিল হৃদয় পালের। সেই স্বপ্নপূরণ করতে বই-খাতা রেখে প্রায় আড়াই মাস আগে বাড়ি ছাড়েন শান্তিগঞ্জের এই তরুণ। চলতি বছর তার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলে বসার বদলে তিনি পাড়ি জমান ভারত, শ্রীলংকা ও দুবাই হয়ে লিবিয়ায়। সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে গ্রিস— তারপর ইউরোপের স্বপ্নের ঠিকানা। কিন্তু আগস্টের প্রথম দিন থেকে হৃদয় লাপাত্তা।
ফোনের ওপাশে আর শোনা যায় না ছেলের কণ্ঠ। কোনো বার্তা আসে না। তিনি কোথায়, কেমন আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না— কোনো উত্তর নেই বাবা রন্টু চন্দ্র পালের কাছে। শুধু অপেক্ষা। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ— ছেলের ফেরার পথ চেয়ে অপেক্ষা।
হৃদয় একা নন। ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্নে লিবিয়া পাড়ি দিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন সুনামগঞ্জের বহু তরুণ। কেউ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পথে নিখোঁজ, কেউ দালাল ও মাফিয়ার হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে কোনো রকমে দেশে ফিরেছেন। গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ৯৫ অভিবাসনপ্রত্যাশী। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জেরই ৬৬ জন।
আর যারা ফিরেছেন, তাদের অনেকের হাতে নেই ইউরোপের স্বপ্ন— আছে নির্যাতনের ক্ষত, ভাঙা শরীর, বিপর্যস্ত মন আর মাথার ওপর লাখ লাখ টাকা ঋণের বোঝা। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের বেশ কয়েকজন তরুণ এখনো নিখোঁজ। তাদের মধ্যে শান্তিগঞ্জের পাগলা শত্রুমর্দন এলাকার হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া, মামুন খান, রনসী গ্রামের মো. তালহা এবং ডুংরিয়া গ্রামের সোহেল মিয়া রয়েছেন। তাদের পরিবারের প্রতিটি দিন কাটছে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায়। সন্তান বেঁচে আছে, নাকি উত্তাল ভূমধ্যসাগরের ঢেউ তাদের কেড়ে নিয়েছে— এ প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে।
সোহেল মিয়ার পরিবারও একইভাবে দিন গুনছে। ঘরে ফিরে আসার কথা ছিল ছেলের; কিন্তু আসছে না কোনো খবর।
ভূমধ্যসাগরে এই স্বপ্নযাত্রা কতটা ভয়ংকর, তার প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া কয়েকজনের বর্ণনায়। খাবার ও পানির সংকটে অন্তত ১১ অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে সম্প্রতি। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাদের চোখের সামনেই একে একে কয়েকজন মারা যান। দিনের পর দিন সাগরে ভেসে থেকে মরদেহে পচন ধরলে শেষ পর্যন্ত সেগুলো সাগরেই ফেলে দিতে বাধ্য হন তারা। মিসরের মার্সা মাতরুহ শহরের একটি সরকারি হাসপাতালে ১৮ বাংলাদেশিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিশোরগঞ্জের দুই তরুণের মৃত্যু হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শান্তিগঞ্জের পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল করিম পরিবারের কাছে পাঠানো ভিডিও ও ভয়েস বার্তায় সেই বিভীষিকাময় যাত্রার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, লিবিয়ার তবরুক শহর থেকে একটি প্লাস্টিকের নৌকায় ৪২ জনকে গ্রিসের উদ্দেশে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে ৩৮ বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানি নাগরিক ছিল।
গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর বিকল হয়ে যায় নৌকার ইঞ্জিন। এরপর ঝোড়ো বাতাসে সাগরে পড়ে যায় খাবার ও পানি। শুরু হয় মৃত্যু আর বেঁচে থাকার লড়াই। ৯ দিন সাগরে ভাসতে ভাসতে নৌকাটি পৌঁছায় মিসরের সীমানায়। এর মধ্যেই মারা যান নয়জন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এভাবেই ইউরোপের স্বপ্ন কখনো কখনো রূপ নেয় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে। যারা সাগরের মৃত্যুফাঁদ থেকে ফিরেছেন, তাদের অনেকের কপালে ছিল আরও ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের আব্দুল লতিফের ছেলে আল আমিন ২০২২ সালে পর্যটন ভিসায় দুবাই হয়ে লিবিয়ায় যান। প্রায় সাড়ে তিন বছর সেখানে কাজ করার পর ভৈরবের এক লিবিয়াপ্রবাসী দালালের সঙ্গে সাড়ে ৭ লাখ টাকায় গ্রিসে যাওয়ার চুক্তি করেন। পুরো টাকা পরিশোধের পর একটি নৌকায় তাদের সমুদ্রে পাঠানো হয়। প্রায় ৬২ ঘণ্টা সাগরে ভাসার পর লিবিয়ার পুলিশ তাদের আটক করে। পরে দালালরা তাদের পুলিশ থেকে ছাড়িয়ে আবারও গ্রিসে পাঠানোর চেষ্টা করে। দ্বিতীয়বারও ধরা পড়েন আল আমিন। এবার তাকে এক মাস পাঁচ দিন কারাভোগ করতে হয়। শেষ পর্যন্ত আইওএমের সহায়তায় দেশে ফেরেন তিনি। দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের খেজাউরা গ্রামের সাইফুল ফজর আলীর গল্প আরও ভয়াবহ। সৌদি আরব ও তুরস্ক হয়ে লিবিয়ায় যাওয়ার পর দালাল তাকে বিক্রি করে দেয় মাফিয়ার কাছে। মুক্তির জন্য তার পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১৫ লাখ টাকা। পরে আরেকটি চক্র গ্রিসে পাঠানোর কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা নেয়। তাতেও শেষ হয়নি দুর্ভোগ। সমুদ্রের পাড় থেকে তাকে আটক করলে পুলিশ থেকে ছাড়ানোর নামে গুনতে হয় আরও ৫ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত ইউরোপ নয়, তার ঠিকানা হয় নিজের দেশ।
জামালগঞ্জের মো. আহাদুল্লাহ চার মাস লিবিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন। এরপর ইউরোপে যাওয়ার আশায় এক দালালের সঙ্গে ৮ লাখ টাকায় চুক্তি করেন। প্রথমে ৩ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়ায় যান। পরে বাকি ৫ লাখ টাকার জন্য দালালরা তাকে আটক করে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে তিনি পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু সেখানেও শেষ হয়নি আতঙ্ক। দেশে তার পরিবারের কাছে নির্যাতনের ছবি পাঠিয়ে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে দালাল চক্র। আহাদুল্লাহ এখনো দালালদের হাতে বন্দি— এমনটি বিশ্বাস করে পরিবার সেই টাকাও পরিশোধ করে।
জামালগঞ্জের ফেনারবাক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের আতাউর রহমানের স্বপ্ন কিনতে হয়েছিল ঋণ করে। ১৫ লাখ টাকা সুদে নিয়ে তিনি সৌদি আরব ও মিসর হয়ে লিবিয়ায় যান। সেখানে পৌঁছেই তাকেও বিক্রি করে দেওয়া হয় মাফিয়ার কাছে। টাকার জন্য শুরু হয় মারধর ও নির্যাতন। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে হাসপাতালের এক চিকিৎসকের সহযোগিতায় তিনি সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছান এবং তাদের সহায়তায় দেশে ফিরতে সক্ষম হন। দেশে ফিরেও তার মুক্তি নেই। ১৫ লাখ টাকার ঋণ এখন সুদে-আসলে প্রায় ৩০ লাখে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপের স্বপ্ন ভেঙেছে; কিন্তু ঋণের বোঝা রয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দালালও কোনো টাকা ফেরত দিচ্ছে না।
সুনামগঞ্জে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের জেলা কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বললেন, গত দুই মাসে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরা সুনামগঞ্জের ৬৬ জনের অনেকেই ঋণগ্রস্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। পুনঃ একত্রীকরণের মাধ্যমে তাদের আবার সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে ব্র্যাক।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানালেন, শান্তিগঞ্জের কয়েক তরুণ লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়ার খবর তারা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজনের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ হয়েছে বলেও জানা গেছে। গত কয়েক মাসে মানব পাচার ও প্রতারণার ঘটনায় সাত থেকে আটটি মামলা করা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্তের সিআইডির কাছে পাঠানো হয়েছে। কয়েকটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, গ্রেপ্তারও হয়েছেন কয়েকজন। কিন্তু অধিকাংশ দালাল দেশের বাইরে থাকায় তাদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাছের থানায় অভিযোগ দিয়ে মামলা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে আইন, মামলা আর তদন্তের বাইরেও সুনামগঞ্জের অনেক ঘরে এখন একটাই অপেক্ষা। কেউ অপেক্ষা করছেন নিখোঁজ সন্তানের একটি ফোনকলের জন্য। কেউ অপেক্ষা করছেন ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির জন্য। আর কেউ দুঃস্বপ্নের মতো লিবিয়ার নির্যাতন ভুলে নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজছেন।






