নকশাতেই আটকা প্রকল্প
দফায় দফায় মেয়াদের সঙ্গে ব্যয় বেড়েছে ৪০০ কোটি

ফাইল ছবি
দেশের চার বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের প্রকল্পে বিরাজ করছে স্থবিরতা। অনুমোদনের পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও নকশাতেই আটকে আছে ১২৩টি প্যাকেজ। শুরু থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে, আর খরচ হয়েছে ১১৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
‘চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন’ প্রকল্পে দেখা গেছে এমন দুরাবস্থা। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের খসড়ায় তুলে ধরা হয়েছে এসব তথ্য। আগামী ৩০ জুন চূড়ান্ত করা হবে খসড়াটি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়া, পূর্ণকালীণ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া, বুয়েটের অতিরিক্ত পরামর্শক ফি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ফি সম্পর্কে ধারণা না থাকা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করা, জনবল নিয়োগ না দেওয়া এবং তদারকির অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পটি।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় যে ১১৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে তার মধ্যে ৭১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ভূমি অধিগ্রহণে এবং ৩৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে চারটি প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ কাজে। অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় করা হয়েছে প্রকল্প অফিসের যানবাহন, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, পরামর্শক সেবা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ।
এতে উল্লেখ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় মোট ৬৫টি পূর্ত প্যাকেজ এবং ৬৫টি পণ্য প্যাকেজ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র তিনটি পণ্য প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে এবং চারটি পূর্ত প্যাকেজে প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ চলমান। অন্যান্য প্যাকেজের কাজ নকশা প্রাপ্তির অভাবে শুরুই হয়নি। তবে প্রতিটি কলেজের ৩টি অ্যাকাডেমিক ভবন, ২টি শিক্ষার্থী হোস্টেলের টেন্ডার আহ্বান ও মূল্যায়নের কাজ চলমান।
আইএমইডির সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা প্রতিবেদনগুলো চূড়ান্ত করার কাজ করছি। এ বছর যাতে অন্য বছরগুলোর মতো না হয় সে প্রচেষ্টা আছে। আমরা চাচ্ছি আইএমইডি যে সুপারিশ দেবে সেগুলো যেন বাস্তবায়ন হয়। সেজন্য বিশেষ উদ্যোগ নেব।’
আইএমইডি সূত্র জানায়, চার বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। ২০১৮ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এর মেয়াদ ধরা হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। পরে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া হয় ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। শুরুতে প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা। পরে ৪০০ কোটি বাড়িয়ে করা হয় ১ হাজার ৬২১ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য স্নাতক পর্যায়ে প্রকৌশল শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ডিপ্লেমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং ও এইচএসসি (ভোকেশনাল) পাশ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ। বর্তমানে দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও বরিশাল বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আছে। প্রকল্পের মাধ্যমে অবশিষ্ট চার বিভাগের খাগড়াছড়ি, নড়াইল, নওগাঁ এবং ঠাকুরগাঁ জেলায় একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি কলেজের জন্য ৮ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয়। তবে জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং কোভিড-১৯ মহামারির কারণে শ্লথ হয়ে পড়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম।
সরেজমিন পরিদর্শনে আইএমইডি বলেছে, নির্মাণাধীন নড়াইল ও ঠাকুরগাঁও প্রশাসনিক ভবনের বিম ও কলামে হানিকম্বজনিত (কংক্রিট ঢালয়ে ফাক বা গর্ত) ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে। নড়াইল সাইটে একই কারিগরি ব্যক্তি একাধিক সাইটের দায়িত্ব পালন করায় তদারকিতে তৈরি হয়েছে দুর্বলতা। আর নওগাঁ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অবকাঠামোর ডিজাইন পর্যালোচনা, সরেজমিন পরিমাপ এবং রিবাউন্ড হ্যামার টেন্টের ফলাফলে রুম, কলাম, বিম, সিঁড়ি ও প্লিন্থ এরিয়ার পরিমাপ ডিজাইন অনুযায়ী সন্তোষজনক পাওয়া গেছে। তবে অধিকাংশ সাইটে নির্মাণকাজে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজনীয়সংখ্যক পরীক্ষণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পন্ন করা হয়নি এবং কিছু সাইটে সীমিত সংখ্যক টেন্ট রিপোর্ট পাওয়া গেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সব সাইটে স্টিল শাটার ব্যবহার করা হলেও নড়াইল পূর্ত প্যাকেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না করায় কাজের অগ্রগতি ধীর। খাগড়াছড়ি প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এবং কার্যাদেশ দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় কাজ শুরু না হওয়ার বিষয়ে প্রকল্প অফিস সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুর্বল মনিটরিং এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। ২০টি পূর্ত প্যাকেজের দরপত্র এখনো মূল্যায়নাধীন থাকায় বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে আইএমইডি।
আইএমইডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, মেয়াদকালীন আগামী ২৬ মাস সময়ের মধ্যে যেমন অবশিষ্ট ৬১টি পূর্ত প্যাকেজ, ৬২টি পণ্য প্যাকেজ এবং ২টি সেবা প্যাকেজের কাজ শেষ করতে হবে, তেমনি চারটি কলেজের প্রস্তাবিত ৮৬৩টি পদ রাজস্ব খাতে সুজন প্রক্রিয়া শেষে নিয়োগও শেষ করতে হবে। সেই সঙ্গে অ্যাকাডেমিক কাজ শুরুর জন্য প্রকৌশল বিভাগগুলোর কারিকুলাম, সিলেবাস তৈরি, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করতে হবে। এসব কাজ সময়ের মধ্যে শেষ করাই এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ।






