৯০ দ্রাঘিমা
বালির বাঁধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমরা এখন যে গতিতে দালানকোঠা, রাস্তাঘাট, নগর-বন্দর নির্মাণ করছি, তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ সারা দুনিয়ার সব বালু শেষ হয়ে যাবে। কথাটা মোটেও ‘কেয়ামত নাজদিক হ্যায়’মার্কা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, যার লক্ষ্য মানুষকে ভড়কে দেওয়া। এ তথ্য দিচ্ছে খোদ জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি। তারা জানাচ্ছে, বিশ্ব জুড়ে এখন প্রতি বছর গড়ে ৫০ বিলিয়ন টন বালু লাগছে নির্মাণকাজে। প্রতি সেকেন্ডে ৬৩টি ট্রাক বা লরি ভর্তি করে বালু তোলা হচ্ছে কোনো না কোনো নদনদী থেকে। আমাদের এই মাটির পৃথিবী যতটুকু বালু তৈরি করতে পারে বছরে, তার চেয়ে দ্বিগুণ হারে আমরা তা খরচ করছি। আর সে কারণে ফুরিয়ে যাওয়ার কথাটা উঠছে।
আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘নটিলাস’ বলছে, শিগগিরই বালু হয়ে দাঁড়াবে বিশ্ব জুড়ে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত, আরাধ্য বস্তু। এটি হবে নিউ গোল্ড বা ‘নতুন স্বর্ণ’। ভবিষ্যতে পানি নিয়ে যত না মারামারি হবে, তার চেয়ে বেশি রক্তারক্তি হবে বালু নিয়ে। এতদিন দেশের পত্রপত্রিকায় বালু ব্যবসা নিয়ে খুনোখুনির খবর দেখে ভাবতাম, এগুলো এমনকি জাতীয় নিউজও নয়, নিতান্ত লোকাল নিউজ। এখন দেখছি, বালু নিয়ে এই মারামারি মোটেও স্থানীয় রাজনৈতিক দলাদলির ব্যাপার নয়, দুনিয়া জুড়ে বালু তোলা নিয়ে মারামারি চলছে। কারণ বিশ্বব্যাপী বালু তোলার বিপুল কর্মযজ্ঞের মাত্র ৩০ শতাংশ বৈধভাবে ঘটছে। সিংহভাগই অবৈধ।
আমি আমার পরিচিত যেসব লোককে গরিব অবস্থা থেকে রাতারাতি বড়লোক হতে দেখেছি, তাদের বড় অংশই বালুর ব্যবসা করে ভাগ্য বদলেছে এবং বলা বাহুল্য, রাজনৈতিক আনুকূল্যপ্রাপ্ত হয়ে।
নেদারল্যান্ডসের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের গবেষক অর্পিতা বিশত তার সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন, চাহিদা হু হু করে বাড়তে থাকায় দুর্বল আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে কম্বোডিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া আর ভারতে বালু ব্যবসাকে ঘিরে এক ভয়ানক মাফিয়া চক্র গড়ে উঠেছে। সারা বিশ্বে ভারতে সবচেয়ে বেশি বালু-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সহিংস ঘটনা ঘটে। যেসব সাংবাদিক অবৈধ বালু ব্যবসা নিয়ে অনুসন্ধান করেন, তারা আক্রান্ত হন। ২০১৯ সালে ভারতে এক সাংবাদিককে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিল বালু ব্যবসায়ীরা।
এরকম কেন হয়? বালু ব্যবসাকে ঘিরে এই মাৎস্যন্যায় কেন? অর্পিতা বলছেন, তেল বা অন্য যেকোনো ধরনের খনিজ থাকে মাটির অনেক গভীরে। সেটা উত্তোলন একটি বড় বিনিয়োগের ব্যাপার। বালু অতি সহজলভ্য। পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী জুড়ে ছড়িয়ে আছে বালু। তুললেই হলো। তা ছাড়া, বালুর এই চাহিদা সেসব দেশেই বুভুক্ষের মতো তৈরি হয়, যে দেশগুলো অনুন্নত, যেসব দেশে আইনকানুন, প্রশাসন অত সংহত হয়নি। এ কারণে বালু তোলা নিয়ে যত অরাজকতা।
দুনিয়াটা এমন বালুভুক হলো কী করে?
মানুষ যা কিছু বানায়, নির্মাণ করে, তার প্রায় সবকিছুতে বালু আছে। সিমেন্ট, কংক্রিট, এমনকি কাচও বানানো হয় বালু বা সিলিকা থেকে। আমাদের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপের মধ্যে যে সিলিকন চিপ থাকে, সেটাও বালু থেকে তৈরি। গবেষক ভিন্স বেইসার তার ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন আ গ্রেইন: দ্য স্টোরি অব স্যান্ড অ্যান্ড হাউ ইট ট্রান্সফর্মড সিভিলাইজেশন’ বইয়ে বলেছেন, ‘বালু ছাড়া আধুনিক সভ্যতা বলে কিছু থাকত না। আমাদের শহরগুলো আক্ষরিক অর্থে বালু দিয়ে বানানো। প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট, প্রতিটি টাওয়ার, প্রতিটি শপিং মল, প্রতিটি সড়ক বালু দিয়ে বানানো।’
আমরা অনেকেই ভাবি, বালু এক অনিঃশেষ, অনন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। দেশে দেশে মরুভূমি জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বালুকা। কিন্তু অতি মিহি হওয়ার কারণে মরুভূমির বালু নির্মাণকাজে ব্যবহারযোগ্য নয়। কিছু বালু সমুদ্রসৈকত ও সমুদ্রের তলদেশ থেকে আসে বটে। তবে দুনিয়া জুড়ে নির্মাণকাজে বালুর সবচেয়ে বড় উৎস নদীর তলদেশ। অতিকায় মেশিন বসিয়ে সমুদ্রের তলা ছেঁচে বালু তোলার এক বিকট আয়োজন আমাদের পরিবেশের কী বারোটা বাজাচ্ছে, তা তো আমরা চোখের সামনে হামেশাই দেখছি।
কথা হলো, বালু যদি অফুরন্ত না হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের শহরগুলোর কী হবে? আমাদের সভ্যতা কি তখন বালুর বাঁধের মতো ভেঙে পড়বে? তেলহীন, বালুহীন যে সভ্যতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, সে সভ্যতায় ঢোকার আগের মুহূর্তটি সবচেয়ে দুঃস্বপ্নের। কারণ, সেই দশায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে হানাহানিময় এক অমানিশা।






