সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রথম প্রয়াণদিবস
তিনি বলতেন, ক্রমাগত জীবনের পাঠ নিতে হবে

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে লেখক
স্যারকে আদর করে দিলাম মাথায়। ঠান্ডা শীতল একটা মাথায়। বিদায় প্রিয় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার। স্যার এই স্যার স্যার করা নিয়ে খুব পঁচাতেন আমাকে। আর হাসতে হাসতে বলতেন—
— জানো তো, স্যার স্যার ব্যবহার করে আমি একটা গল্প লিখেছি, নাম কাঁঠালকন্যা।
—জ্বী স্যার। স্যার স্যার মানে আপনার ছাত্র যে স্যার স্যার বলে সব বুঝিয়ে দেয় সেই গল্প!
স্যার ফেটে পড়তেন অট্টহাসিতে। আমাদের আলাপ গল্প কবিতা হয়ে চলে যেত চলচ্চিত্র— নতুন কে ভাল লিখছেন— কেন ভাল লেখা, ভাল লেখা আসলে কী এইসবে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের সাথে আমার পরিচয় দেখাটেখা-হওয়াটা একটু ব্যতিক্রমী, অন্য যাদের সাথে আমার সাহিত্যিক সম্পর্ক আছে তাদের তুলনায় ত একেবারে ইউনিক বলা যায়।
ব্যক্তি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সাথে আমার পরিচয়ের অনেক আগে লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। সেটা ২০০৩/৪ সালের দিকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্গোপম ক্যাম্পাসে ঢুকে কবি সাহিত্যিক মহলে ঘাড়ত্যাড়া এঁড়ে তার্কিক হিসেবে বদনামসমেত যখন বটতলা, পুরান কলা, নতুন কলা আর ট্রান্সপোর্টে রাজা উজির মেরে বেড়াই— এমন এক দিনে টিএসসিতে এক ওয়ার্কশপে এসে সেলিম আল দীন স্যার খুব প্রশংসা করলেন 'নন্দনতত্ত্ব' বইটার। এবং বললেন আমাদেরকে অবশ্যই পড়তে, পড়লে নাকি আমরা মূর্খরা; চক্ষুহীনরা— সুন্দর চিনতে শিখব, আমাদের চোখ গজাবে! আমাদের বান্ধবীরা কত সুন্দর তা আমরা বুঝতে পারব। স্যারকে শ্রদ্ধা করতাম বলে, ভয় পেতাম বলে, বলতে পারি নাই, স্যার আমরা ত তাদের এমনি এমনি পাত্তা দেই না, তারা সুন্দর বুঝি বলেই দেই!
যা হোক ক্যাম্পাসের বাসে এসেই আজীজ এর সন্দেশ থেকে কিনেছিলাম সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা বই, নন্দনতত্ত্ব। সেসময় বইটা পড়ে কোন কোন পাঠচক্রেও আমরা খুব তর্কাতর্কি করেছিলাম। ৬৪ পাতার সেই ছোট্ট বইয়ে কী দারুণ করেই না নন্দনের তত্ত্ব ব্যখ্যা করেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কত পঠন আর পর্যবেক্ষণের যে সুলল ফলাফল তাতে।
এখনো মনে আছে, ছয়টা অধ্যায়ে তিনি খুবই বোধগম্য নান্দনিক গদ্যে ব্যাখ্যা করেছিলেন, নন্দনতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব ও দর্শন, শিল্পে রূপ ও রস, শিল্পের সুন্দর ও অসুন্দর, শিল্পের প্রকাশ ও ভাষা, শিল্পবিচার এবং হৃদয়ের সঙ্গে যোগ। সেই বইয়ে আরও কত বই পাঠের যে রেফারেন্স ছিল, নন্দনের অন্তত গোটা বিশেক বই পড়া হয়েছে আমার ঐ পুস্তকপাঠের কারণে। বাংলা সাহিত্যে যারাই অবদান রাখতে চান আমি এখনো মনে করি তাদের সকলের জন্য এ বই অবশ্যপাঠ্য।
যা হোক, নন্দনতত্ত্বের পর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের একাধিক গল্প নানা পত্রপত্রিকায় পড়েছি। উপন্যাস পড়া তখনো হয়নি। পড়ব পড়ব যোগাড় করবো মনে করে হয়ে উঠছিল না। এর মধ্যে নানা উত্থান পতন আন্দোলন প্রেম-বিরহে বছর তিন পেরিয়ে গেল চোখের পলকে। সুন্দর সময় কেন যে এত দ্রুত চলে যায়!
এই ঘটনার বছর ছয়েক পর ব্যক্তি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সাথে আমার দেখা হওয়া শুরু হলো। স্যরি, দেখা না আসলে— কথা! ততদিনে আমি মোটামুটি কবি হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করেছি (বিনয় করে নামডাক বললাম না), নানা লিটলম্যাগ ও পত্রপত্রিকায় কবিতা ছাপাও হচ্ছে, অনেক সম্পাদকরা লেখা চাইছেন, না চাইলে অবশ্য তখনো আমি কাউকে লেখা দিতাম না, এখনো দেই না। ২০০৮/৯ এর দিকে অগ্রজ কবি শামীম রেজার বদান্যতায় আমি দৈনিক কালের কণ্ঠের জন্য কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের একটা দীর্ঘ আত্মজৈবণিক সাক্ষাৎকার নেই। আমার শিমুল সাক্ষাৎমালার প্রথম বই কবির মুখোমুখি কবির ভুমিকায় ঘটনাটা আছে, না বিস্তারিত লিখি আর— সেই সাক্ষাৎকার যেদিন প্রকাশিত হয় তার দুদিন পরের ঘটনা। একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসে। সালাম দিয়ে ধরার পর ওপাশ থেকে একজন বললেন, আপনি কী শিমুল সালাহ্উদ্দিন! আমি বললাম জ্বী, আপনি কে বলছেন! উনি পরিচয় দিলেন, আমার নাম সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াই। আপনার নেয়া সাক্ষাৎকারটা পড়েছি কালের কণ্ঠে। খুব ভালো সাক্ষাৎকার হয়েছে। আর আপনার গদ্যটা এত ভাল, বহুদিন পর কারও গদ্য আমার পছন্দ হয়েছে। ততক্ষণে আমি প্রায় উড়ছি— আমাকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ফোন করেছেন, উড়বার পক্ষে এ-ইতো যথেষ্ট। তায়, প্রশংসাও করছেন।
আমি উনাকে বললাম, স্যার এটা আমার করা প্রথম ইন্টারভিউ, আর গদ্যের ক্রেডিট আমার একার না, এখানে বিশাল শামীম রেজা বাহিনীর অবদান আছে। ঐ দলে আছেন মাসুদ হাসান, সফেদ ফরাজী, মাহমুদ শাওন, জুয়েল মোস্তাফিজ এবং বিল্লাল মেহেদী। আমার সাক্ষাৎকারটা স্যার প্রায় অপাঠ্য ছিল, উনারাই পাঠযোগ্য করেছেন। উনি ততক্ষণে স্বাভাবিক স্বরে ফিরেছেন—বললেন, লেখাটা ছাপা হয়েছে তোমার নামে, ফলে এর লেখক তুমি। সম্পাদকের কাজই ত লেখককে পাঠকের কাছে তুলে ধরা। স্যার তখন সম্পাদক ও লেখদের নিয়ে রসিকতা শুরু করলেন, জেনে খুশি হলেন যে, আমি চিনতে পেরেছি আর নন্দনতত্ত্বও পড়েছি। স্যার সেদিন একটা ফোনকলে আমার কাঁধে ডানা লাগিয়ে দিলেন, আমি যে এরপর প্রচুর সাক্ষাৎকার নিয়েছি আর কবিতার বাইরে সাক্ষাৎকার নিতে রত রয়েছি, এতে আছে স্যারের সেদিনের ফোনকলের এক বড় অবদান। শুধু ফোনকলের নয় অবশ্য, স্যার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হওয়ার পরের সপ্তাহে দৈনিক প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া তার কলামে আমার সাক্ষাৎকারটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। রফিক স্যার সে লেখা পড়ে বলেছিলেন, 'তুমি ত বিশাল সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে গেছো হে'।
এরপর প্রায়ই স্যারের সাথে দীর্ঘসময় ধরে আমার ফোনে কথা হতো। কোন দৈনিকে আমার কবিতা ছাপা হয়েছে আর স্যার আমাকে কল করে মুগ্ধতা কিংবা ফ্লস জানান নাই, এ প্রায় হয়ই নাই। তবে যেহেতু স্যারের লেখাই বেশি ছাপা হতো, বেশিরভাগ সময় লেখা পড়ে আমিই স্যারকে ফোন করতাম। স্যার বলতেন, ঢাকায় এলে যেন তার কলাভবনের রুমে যাই, পৌঁনে পাঁচটা পর্যন্ত তিনি থাকেন। কিন্তু এত খাতির হওয়ার আগের আরেকটা গল্প আছে। প্রথম দেখার।
স্যারের সাথে প্রথম দেখা হলো সেই ইংরেজি বিভাগের রুমেই, তবে আমি গেলাম বেহায়ার মতো প্রথম দিনেই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে। বিপদটা আগে বলি, ক্যাম্পাস থেকে আমরা প্রায়ই নীলক্ষেতে বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে বইয়ের সন্ধানে ও পড়তে আসতাম। আমরা বলতে এখানে আমি, নির্লিপ্ত নয়ন ওরফে অধুনা আলতাফ শাহনেওয়াজ এবং তৈমুর রেজা। আমি এমনই একদিন নীলক্ষেতে এসে তেঁতুলতলায় দেখি অনেকগুলি দুষ্প্রাপ্য বই। এবং সবগুলো বই-ই ছান্দসিক আবদুল কাদিরকে কবি সাহিত্যিকরা অটোগ্রাফসহ উপহার দিয়েছেন। এবং সেখান থেকে দুচারটি বই নীলক্ষেতের মামা বিক্রি করবেন না, একসাথে পুরো বাঞ্চটি নিতে হবে। ৩০টা বই একজনের কাছেই বিক্রি করবেন তিনি। কী বিপদ। ক্যাম্পাসে বাড়ি থেকে যা টাকা আনি তা ত উড়ে যায় মাসের প্রথম দশদিনেই। রুমের কম্পিউটারে থিসিস টাইপ করে, প্রিন্ট দিয়ে দিয়ে কিংবা বাংলাবাজারের অর্ডারি বেনামি লেখা লিখে যে টাকা কামাই তা দিয়ে বইপত্র কিনে কোনরকম বন্ধুদের নিয়ে বটতলায় রাজ্জাক ভাইয়ের দোকানে ধারে বাকীতে খেয়ে-টেয়ে দিন পার করি। একসাথে ৪০০০ টাকা সেদিন আমি কই পাব? কিন্তু ঘন্টাখানেক ধরে তেলাতেলি করে নীলক্ষেতের তেহারি খেয়ে এসেও দোকানদার মামাকে পটাতে পারি না। উনি ৪০০০ থেকে ৩০০০ এ নেমেছেন, কিন্তু টাকাটা তাকে নগদ দিতে হবে। আমার কাছে আছে তখন হাজার খানেক টাকা। হঠাৎ উইরেকা-টাইপ বুদ্ধি এলো মাথায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ত পরিচিত লোকজন আছে, অধ্যাপক ড. নিরঞ্জন অধিকারী আছেন, আনিসুজ্জামান স্যার আছেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার আছেন, গিয়ে চাঁদাবাজি করে এলেই ত বইগুলো আমার হয়ে যায়। তেঁতুলতলায় সিগারেট টানতে টানতে মনস্থির করলাম, আগে মনজু স্যার, তারপর বাকী দুজন।
যেই ভাবা সেই কাজ। গেলাম কলাভবন, গিয়ে দেখি বাংলা বিভাগের সব রুম তালাবদ্ধ। কেউ নাই। ইংরেজি বিভাগে গিয়ে দেখি সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার বিশাল এক গ্রুপকে নিয়ে বসেছেন, সম্ভবত থিসিস গ্রুপ। তার আন্ডারে যারা এমফিল বা পিএইচডি করছেন তাদের গ্রুপ। স্যারের সাথে আমার আগে কথা হওয়ার কথা ত বললামই, কিন্তু দেখা ত হয় নাই, স্যারকে আমি চিনি, স্যার ত আমাকে চেনেন না। আমি রুমের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তখন আমাদের হাতে হাতে মোবাইল আর যখন তখন মোবাইলে ফোন দেয়া কিন্তু এত এভেইলেবল হয় নাই।
একবার ভাবলাম চলে যাই, লজ্জ্বা লাগছে, আরেকবার ভাবলাম, না বলেই দেখি না স্যারকে! এমন দোলাচলে যখন ভুগছি তখন একজন জানালা দিয়ে আমাকে দেখে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? এখানে পড়ি নাকি! আমি বললাম, না জাহাঙ্গীরনগরে পড়ি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছি। স্যারের ক্লাস শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। উনি ভেতরে গিয়ে বলতেই স্যার বললেন, আসেন, বলেন কী চান! আমি বললাম স্যার আমার নাম শিমুল। আপনি আমাকে কিছুদিন আগে ফোন করেছিলেন। স্যার আমি একটা বিপদে পড়েছি। আমার হাজার তিনেক টাকা লাগবে। স্যারের চারপাশে বসা শিক্ষার্থীদের চোখ বড় হয়ে গেল, ভাবলেন হয়তো তারা, নিশ্চয়ই এক বাটপার এসে জুটেছে, কোন গল্প বানিয়ে টাকা নিতে চাচ্ছে।
স্যার বললেন, কেন এত টাকা কেন লাগবে? কী হয়েছে? বিপদটা কী? আমি বললাম— স্যার সবার সামনে বলব? স্যার বললেন, অসুবিধা না থাকলে বলো। আমি খুলে বললাম হর-বর করে, স্যার ছান্দসিক আবদুল কাদিরের বাড়ির বই কেউ নীলক্ষেতে বিক্রি করে দিয়েছে, আমি বইগুলো কিনতে চাই কিন্তু এখন পুরো টাকাটা নাই, ক্যাম্পাস ফিরে গেলে বইগুলো বিক্রি হয়ে যাবে, আমি আর পাব না!
স্যার বললেন, তুমি ত দেখি আচ্ছা পাগল! বলে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এমন পাগল আগে দেখেছ! স্যারের শিক্ষার্থীরা প্রায় সবাই একযোগে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন। এদিকে আমি খুবই ক্লিন্ন বিব্রত হয়ে বসে আছি। স্যারসহ সবাই আমার কাচুমাচু চেহারা দেখে হেসে ফেললেন। স্যার শিক্ষার্থীদের বললেন, আজই প্রথম দেখা কিন্তু শিমুলকে আমি চিনি, তিনি আমার ইন্টারভিউটার কথা শিক্ষার্থীদের বললেন। আমি বেশ খুশি হলাম শুনে যে স্যার আমার কবিতারও প্রশংসা করলেন তাদের সামনেই। আমাকে নিজের মানিব্যাগ খুলে ৩০০০ টাকা দিয়ে বললেন, এটা তোমার উপহার। আমার আবেগে চোখে পানি এসে গেল। আমি বললাম, স্যার যাই, বইগুলো কেউ নিয়ে যাবে। স্যার বললেন, চা খেয়ে যাবে না! আমি বললাম না স্যার, বইগুলো অন্যকেউ নিয়ে গেলে খুব খারাপ লাগবে, আপনার টাকাটাও কাজে লাগবে না।
স্যারের থেকে টাকা নিয়ে দৌঁড়ে গেলাম নীলক্ষেত, তারপর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী হয়ে গেলাম। ৩০টা বই দৈনিক পত্রিকায় বেঁধে জাহাঙ্গীরনগরের বাসে উঠলাম আমি সম্রাট শিমুল সালাহ্উদ্দিন। ক্যাম্পাস গিয়ে স্যারকে ফোন করে বললাম, স্যার সামনের মাসে টাকাটা ফেরত দিতে আসব আমি। স্যার মজা করে বললেন, আমাকে বইগুলো দিয়ে দাও। টাকা লাগবে না। আমি বললাম, কী বলেন স্যার, বইগুলো ত দেয়া যাবে না। স্যার বললেন, তাহলে টাকাও লাগবে না। আমাকে বইগুলোর নাম বলো! সেখানে ছিল ষাটের দশকের প্রায় সব কবির বই, সবই প্রথম সংস্করণ। মোহাম্মদ রফিকের কপিলা থেকে শুরু করে সৈয়দ হকের পরানের গহীন ভিতর, নির্মলেন্দু গুণের প্রেমাংশুর রক্ত চাই— সব স্বাক্ষর করা কবিদের আর ভাল ভাল কথা লেখা!
আমি কাচুমাচু করে বললাম স্যার, টাকাই দেই, বই না দেই স্যার। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বললেন স্যার, আমি কী তোমার থেকে সাম্রাজ্য কেড়ে নিতে পারি, টাকা যখন পারো দিও।
স্যারকে এরপর ১২ বছর জুড়ে আমি টাকাটা দিয়েছি নামকাওয়াস্তের কিস্তিতে কিস্তিতে, ৫০০ টাকা দেয়ার নাম করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষে কিংবা বাসায় গিয়ে ১০০০ টাকা খেয়ে এসেছি বন্ধুবান্ধব নিয়ে, এক লক্ষ টাকার চোখ খুলে দেয়া কথাবার্তা শুনে এসেছি আমরা। আমাদের আড্ডা ছড়িয়ে পড়েছে কত কত স্থানে কালে— লালমাটিয়া, ঈদসংখ্যার অনুষ্ঠানের ঢাকা ক্লাব, মোহাম্মদপুর, বনানী শাকুর ভাইয়ের অফিস, আবাহনী মাঠের কোনায় স্যারের বাসা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বাতিঘর, সম্প্রতি এই কিছুদিন আগে সবশেষ কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদের বাসায় স্যারের সাথে দেখা হলো।
আড্ডা জমাতে একজন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম থাকলে আর কী লাগে। চলন্ত বিশ্বসাহিত্যকোষ তিনি, আর বয়স সবসময় আমার চেয়েও কম— বাস্তবকে যেমন ফিকশনাল করে তুলতে পারেন রসিকতার চূড়ান্ত ব্যবহারে, আবার এক্কেবারে বানানো কিছু চরিত্রকে তিনি বাস্তবের ফ্রেমওয়ার্কে ফেলে নতুন এক অধিবাস্তব ভুবনে আমাদের নিয়ে যান। আমাদের ক্রমাগত জীবনের পাঠ নিতে বলেন, নিজের গল্পের ভেতর দিয়ে কথাসাহিত্যের ভেতর দিয়ে সে পাঠ জারিত করতে চান পাঠকেরও প্রাণে।
স্যারকে একবার ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করলাম একটা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি গল্প, প্রবন্ধ লিখছেন, চিত্র সমালোচনা করছেন, নন্দনতত্ত্ব নামে আপনার একটা বই আছে। সিনেমা নিয়েও লিখেছেন। আপনার এই যে ইন্টারডিসিপ্লিনারি যাতায়াত সেটা এখনকার লেখকদের মধ্যে কম দেখা যায়। আপনার মত কী?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমার মনে হয়, সব লেখকের ইন্টারডিসিপ্লিনারি হওয়া উচিত। না হলে কাজে বৈচিত্র্য আসবে না। এতে কাজের ক্ষেত্রে, প্রত্যেক বিষয়ের স্পন্দন বা ইংরেজিতে যাকে ‘ভাইব’ বলে, তার অনুভবটা পাওয়া যায়। প্রত্যেক বিষয়ের যে একটা নিজস্বতা আছে, শক্তি আছে সেটা জানার সুযোগ হয়। আমি যখন পত্রিকায় কলাম লিখতে শুরু করি, সাংবাদিকদের জীবনকে সামনাসামনি দেখেছি, শ্রদ্ধা করতে শিখেছি তাদের কাজকে। তাদের কাজের চরিত্র বোঝার চেষ্টা করেছি। যখন আমি শিল্পীদের জীবনে প্রবেশ করলাম, তারা যে প্রাণবন্ত, সৃষ্টিশীল মানুষ ও স্রষ্টা, তাদের ভেতর যে শক্তি আছে আমি সেসব দেখতে ও বুঝতে চাইলাম। পারলাম হয়তো। ফলে আমার শিক্ষাজীবনে অনেকখানি পূর্ণতা এসেছে। এই বিচিত্রভাবে, বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে মেলামেশার কারণে আমার ভেতরটা প্রসারিত হয়েছে। যাকে আমরা ‘প্রেজুডিস’ বলি, আগে থেকেই একটা বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পুষে রাখা, সেটা আমাকে কখনো কাবু করতে পারেনি, হয়তো ওই ইন্টারডিসিপ্লিনারির জন্য।
আমি যতই বিভিন্ন বিষয়ের গভীরে গিয়েছি, বুঝতে পেরেছি, সব বিষয় নিয়েই আমাদের জীবন। কাজেই সেখানে যদি আমি একটা বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বসে থাকি, ক্ষতিটা আমারই। যারা তরুণ তাদের বলব, আপনারা বিস্তৃত হন। বিস্তৃত না হলে আপনাদের কবিতা গল্প নাটক জীবনকে স্পর্শ করবে না। কবিতা গল্প এসব তো জীবন নিয়েই। জীবনকে শুধু একটা জায়গায় আটকে রাখতে হয় না। আড্ডায় যেতে হয়। আমি আবারও বলি জীবনকে দেখতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে। ক্রমাগত জীবনের পাঠ নিতে হবে।"
আরও কত কথা যে মনে পড়ছে, লিখতে না পারার মতো বিবশ হয়ে বসে থাকি স্যার, যে অজানার দেশে আছেন, খুব ভাল যেনও থাকেন স্যার।










