ঝরাপাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক মাস হয়ে গেল বাবা চলে গেছে। আমি হলের নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি একরকম।
প্রথম দুটো দিন ছিল ভয়াবহ। মনে হচ্ছিল কেউ বুকের খানিকটা খাবলা মেরে নিয়ে গেছে। সেই শুন্যতার মধ্য দিয়ে বয়ে যাচ্ছে হাহাকার করা বাতাস। বুকটা নিঃস্ব , খালি হয়ে যাওয়ার সেই অদ্ভূত অনুভূতি আর সহজে যায় না। ফিরে ফিরে আসে। কোনো জানান না দিয়েই। ব্যাপারটা শুধু হারানোর দুঃখ বলবো না, এর মধ্যে মিশে আছে এক ধরনের ভয়ও।
দাদুর সঙ্গে আর কখনোই যদি দেখা না হয়? বা ইগরের খারাপ কিছু হয়ে যায়? মাথা থেকে কিছুতেই যাচ্ছিল না এ চিন্তা।
বাবা মা ও শাসাকে ভলেনাভাখার দাচার সেই প্রাণহীন একঘেয়ে পরিবেশে ফেলে এসেছি। নৈঃশব্দ আর অনিশ্চয়তাই তাদের নিত্যসঙ্গী। আর আমি বসে আছি শান্ত নিরিবিলি ঝলমলে কিয়েভে। ভাবতেই মাথাটা কেমন করে ওঠে।
আমার রুমমেট কাতিয়া কথা বলতেও পারে বটে!
প্রথম দিনদুয়েক সে একটূ দূরত্ব রেখেই চলছিল। নম্রভদ্র, ফর্মাল ধরনের আচরণ। ব্যক্তিগত বিষয়ে আলাপ এড়িয়ে চলেছে। কিন্তু যেই না একসঙ্গে কমন কিচেনে গেলাম, অমনি যেন ওর কথার বাক্সের ঢাকনা খুলে গেল। তারপর থেকে নিজের ঘর ছাড়া হওয়ার দুঃখ নিয়ে একা বসে যে একটু ভাববো সে সুযোগটুকুও কাতিয়া দেয়নি।
কাতিয়া এক বছর আগে রিভনে থেকে এসেছে এখানে। ফার্স্ট ইয়ারে কোন দিকেই বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি ও। রাজধানীতে এসে দেখিয়ে দেওয়ার চিন্তায় টগবগ করতে থাকা গ্রামের অনেক চালাক চতুর ভাব দেখানো ছেলেমেয়েরই যা হয়। কাতিয়ার সে পর্ব অনেক আগেই শেষ। এখন তিনটা মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে ঘুরছে তার যাপিত জীবনের চাকা- ক্লাসের লেকচার, কোচিং ক্লাসে পড়ানো আর নিজের সুন্দর শরীরটির যত্নে মগ্ন থাকা।
কিমোতে আসা খানদানি পরিবারের ছেলেদের নজর কাড়ার চেষ্টা করে কাতিয়া ব্যাপক ধরা খেয়েছিল। এই ছেলেরা একেকটা স্মার্টের চূড়ান্ত। এক গ্লাস ওয়াইন নিয়ে কয়েক মিনিট কোণের টেবিলে বসলেই বের করে ফেলবে তোমার মফস্বল বা গ্রামের ঠিকুজি। কাপড়চোপর যদি তোমাকে ধরিয়ে না-ও দেয়, উচ্চারণ ঠিকই দেবে। নাহলে বুঝে যাবে ওয়াইন গ্লাসে প্রথম চুমুকের পরে তোমার মুখের ভাবটা দেখে। এক নম্বর নিয়ম হচ্ছে : কী ড্রিংক করছো জিজ্ঞেস করা যাবে না। স্বাদে মুগ্ধতার ভাব দেখানো তো যাবেই না। কারণ, তুমি ওদের সার্কেলের যোগ্য হলে এসবে তো অভ্যস্ত থাকারই কথা।
আজ কাতিয়া আর আমি একটা লেকচার শুনতে এসেছি। মানবিক আইন না মানবাধিকার আইন বা এমন কিছু একটা হবে, শিউর না আমি। গত সপ্তাহে ভ্লাদ আঙ্কেল ফোন করে বললেন সিরিজটায় যোগ দিতে। তার বস তরুণদের উৎসাহিত করতে বক্তব্য দেবেন। যুদ্ধপীড়িত অঞ্চল নিয়ে বিস্তর অভিজ্ঞতা নাকি ভদ্রলোকের। জোরাজুরি করে কাতিয়াকেও আসতে রাজি করে ফেলেছি আমি।
নীরস কেতাবি আলাপের ভয় পাচ্ছিলাম আমরা। কিন্তু প্রথম লেকচারটা দারুণ ইন্টারেস্টিং হলো। আমরা যে সবিকছু বুঝলাম তা না, কিন্তু বক্তার কথা বলার ভঙ্গিটা দারুণ। সত্যি বলতে কী, মানুষটাকেও বেশ ভালো লেগে গেল আমাদের। উগান্ডা থেকে আসা এই বক্তার নাম উইলিয়াম ওকেলো লাবোঙ্গো। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষটির কথা, ভাবভঙ্গী একেবারেই অন্যরকম। এ কারণেই হয়তো অর্ধেক কথাই মাথার উপর দিয়ে গেলেও মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছিলাম।
লেকচার শেষে ছাত্রছাত্রীরা ঘিরে ধরলো ভদ্রলোককে। অনেকের মুখেই প্রশ্ন। কথা বলতে বলতে ক্যান্টিন পর্যন্ত তার পিছে পিছে চলল সবাই। আমাদের দুজনের এই হুড়োহুড়ির মধ্যে ঢোকার তেমন ইচ্ছা হচ্ছিল না। ঠিক করলাম, এর পরের বার উনার সামনে যাবো।
উইলিয়াম ওকেলো লাবোঙ্গো (উনি চান তাকে শুধু ‘ওকেলো’ ডাকি আমরা) মানুষটার মধ্যে বিশেষ একটা কিছু আছে, মানতেই হবে। কাতিয়া তো এরই মধ্যে তার সম্পর্কে আরও জানার জন্য ছটফট করছে। ওর আর দোষ কী দেব! মানুষটা সত্যিই কৌতুহল জাগিয়েছেন অল্পবয়সী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। আফ্রিকার একজন কালো মানুষ, নাম তার আবার উইলিয়াম। এমন একজন আফ্রিকানের দেখা পাওয়ার কথা এখানে কে ভেবেছিল বলো!
ওকেলোর দ্বিতীয় লেকচারটা তুলনায় সহজ ছিল। এবারের সাবজেক্ট ছিল মানবিক নীতিমালা। আগের প্ল্যানমতোই আজকের লেকচারের পর অন্যদের সাথে তার পিছু নিলাম আমি আর কাতিয়া। ক্যান্টিনে গিয়ে শুরু হলো আলাপ। লোকটা কথা বলতে পছন্দ করে বটে! ঘরে ফেরার কোন তাড়া দেখলাম না তার মধ্যে।
একে একে অন্য সবাই চলে গেলেও আমি আর কাতিয়া রয়ে গেলাম। তারপর কাতিয়া খুলল তার অফুরন্ত প্রশ্নের ঝুলি। ওকেলো জানালেন, তিনি হচ্ছেন উত্তর আফ্রিকার আচোলি জনগোষ্ঠীর মানুষ। এখন যেখানে সাউথ সুদান নামের নতুন রাষ্ট্রটি সেখানেই তাদের আদি নিবাস। এখন আচোলিরা মূলত উত্তর উগাণ্ডায় থাকে। গুলু ও আশপাশের এলাকায়। বলতে লজ্জা নেই, সারা জীবনে আফ্রিকা সম্পর্কে যতোটা শিখেছিলাম এক সন্ধ্যায় তার চেয়ে বেশি জানা হলো আমার।
তৃতীয় লেকচারের পর কাতিয়া সরে পড়লো। আমি অবশ্য এতে অবাক হইনি মোটেই। বোঝাই যাচ্ছিল, ওকেলোকে নিয়ে ওর কৌতুহল মিটে গেছে। তবে আমি চালিয়ে গেলাম। ওকেলো এখন আর অপরিচিত কেউ নন; আমাকে দেখলে চিনতেও পারেন। প্রতি সপ্তাহে যতই ওকেলোর সঙ্গে ক্লাসের পর গল্প করতে বসছি ততই যেন উনি বেশি করে টানছেন আমাকে। এ আকর্ষণ শুধু আইডিয়ার জন্য না, ওকেলোর যুক্তিতর্কের স্পষ্টতা আর ধারেও মুগ্ধ আমি।
ধার্মিক এক খ্রিস্টান পরিবারের মানুষ উইলিয়াম ওকেলো লাবোঙ্গো। বাবা-মার তৃতীয় সন্তান ও একমাত্র ছেলে। তার বড় দুই বােন জমজ। আর সে কারণেই তার নাম ওকেলো। কথাটার অর্থ নাকি জমজের পরে জন্মানো বাচ্চা।
ওকেলোর ছোটবেলার বেশিরভাগটাই কেটেছে উত্তর উগাণ্ডার গুলুর আচোলি সমাজে। বেশ কম বয়সেই দুই বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। দুজনেরই বর এলাকার আচোলি গোষ্ঠীর মানুষ। পরে রাজধানী কাম্পালায় থিতু হয়েছে ওরা।
ওকেলোকে ছোটেবলায় কাম্পালার বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়। দেশটির উত্তরাঞ্চলে খুব ভালো বিকল্প ছিল না তখন। তার বাবা-মা ১৯৯৬ পর্যন্ত গুলুতে থেকে গিয়েছিলেন। ওই বছর সরকার কয়েক লাখ আচোলিকে উচ্ছেদ করে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে পাঠায়। সেটা জোসেফ কোনির লর্ডস রেজিস্ট্যান্স আর্মির বিদ্রোহের সময়ের কথা। ওকেলোর বাবা-মাকে অবশ্য শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়নি। তার বাবা অ্যাংলিকান চার্চের গুলু ডায়োসিসের এক প্রভাবশালী পদে ছিলেন। চার্চের সহায়তা নিয়ে তিনি সস্ত্রীক যুক্তরাজ্যের ভিসা যোগাড় করতে পেরেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা সেখানেই থিতু হন। বেশ কয়েক বছর পরে, কাম্পালায় হাইস্কুল ও কলেজের পড়াশোনা শেষ হলে ওকেলো তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ততদিনে তার বাবা-মা যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থাকার বৈধতা পেয়ে গেছেন। কাজেই তারা নিয়ম অনুযায়ী ছেলের অভিবাসনের জন্য স্পন্সর করেন। এরপর কেমব্রিজে আইন পড়তে ভর্তি হন ওকেলো। বার অ্যাট ল হয়ে লন্ডনে ব্যারিস্টারি শুরু করেন তিনি।
উগান্ডার আদি বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে একসময় ওকেলো যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ডে একটা স্কলারশিপ পেয়ে যান। হার্ভার্ডে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন। ওকেলো হার্ভার্ডের ডিগ্রি শেষে লন্ডনে লাভজনক আইনব্যবসায় ফিরে না গিয়ে বলকান অঞ্চলে মানবাধিকার সেক্টরে চাকরি নেন। এতে তার বাবা কষ্ট পেয়েছিলেন খুব। তার কাছে এটা ছিল ছেলের মেধা আর দীর্ঘদিনের লেখাপড়ার চরম অপচয়। এত সাধ্যসাধনার পর মাঠপর্যায়ের এলেবেলে কাজ কেউ করে যার কোন স্বীকৃতি নাই? তবে ওকেলো নিজে তার কাজকে ভালোবাসেন। যুদ্ধবিগ্রহ বা সংঘাতকবলিত এলাকায় কাজ করতে যদিও এখনো ভয় করে তার।
ওকেলোর লেকচার সিরিজ শেষ হওয়ার পর দুই সপ্তাহ চলে গেছে। এদিকে কাতিয়ার বয়ফ্রেন্ড মিকিতার শুনলাম তার ব্যাপারে বেশ কৌতুহল। প্রেমিকার মুখে ওকেলোর কথা শুনতে শুনতে তার নাকি কান পচে যাওয়ার অবস্থা। এবার সে নিজেই ওকেলোর সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমরা তার ব্যবস্থাও করলাম। আজ বিকেলে আমরা সেন্ট সোফিয়া’স স্কোয়ারে ওকেলোর সঙ্গে দেখা করবো। অফিস আওয়ার শেষ হলে ওকেলো সেখানে আসবেন।
মিকিতা কিমোতেই ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। সে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটা ইন্টার্নশিপ শুরু করেছে কিছুদিন হলো। মন্ত্রণালয় দপ্তরের বিশাল তোরণের সামনে মিকিতার সঙ্গে দেখা করলাম আমরা। ওকেলো আসতে তখনো একটু দেরি। হাতে সময় থাকায় মিকিতা আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখালো আমাদের।
কিয়েভের ফিউনিকুলার রেলওয়ে, নিরিবিলি একটা পার্কের ওপাশে বয়ে চলা দনিপ্রো নদী, সেইন্ট মাইকেলস মঠের সোনালী গম্বুজ আর একটা পাঁচ তারকা হোটেল দেখা হলো হাঁটতে হাঁটতে।
সেন্ট সোফিয়া’স স্কোয়ারে পৌঁছেই ওকেলোকে পেয়ে গেলাম আমরা।
(চলবে)






