তারুণ্যের প্রজ্ঞার স্ফুরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এবং ২০০২ সালে উপহার পাওয়া ‘মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মারকগ্রন্থ’ হঠাৎ করেই খুঁজে পেলাম। বইটির পৃষ্ঠা খুলে গেছে কিন্তু গুরুত্ব অম্লান। নতুন করে পড়তে গিয়ে দেখি এ গ্রন্থের উপযোগিতা এখনো একটুও কমেনি।
আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত ‘মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মারকগ্রন্থ’-এর ভূমিকাংশ বিশ্লেষণ করলে গ্রন্থটির প্রেক্ষাপট, প্রয়োজন এবং গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমে স্থির করা হয়েছিল লোকসংস্কৃতিচর্চার পথিকৃৎ অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের জীবিতাবস্থায় তার সম্মানে একটি ‘সংবর্ধনা-গ্রন্থ’ প্রকাশ করা হবে। এই লক্ষ্যে প্রস্তুতি ও ছাপার কাজও শুরু হয়েছিল। ছাপার কাজ শুরুর পর মুহূর্তেই তিনি মারা যান। ফলে মূল সংবর্ধনা-গ্রন্থের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সুযোগ থাকে না এবং শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শে এটিকে ‘স্মারকগ্রন্থে’ রূপ দেওয়া হয়। জীবিতাবস্থায় পরিকল্পিত ‘সংবর্ধনা’ এবং প্রয়াণের পর প্রাপ্ত ‘স্মরণ’— এ দুয়ের সমন্বয়েই গ্রন্থটির রূপরেখা তৈরি হয়। কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দূর-মফস্বলে (কুষ্টিয়ায়) বসে সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এই স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল। লোকসাহিত্য পত্রিকার পক্ষ থেকে এটি প্রকাশ করেছেন আমিনুল ইসলাম আর পরিবেশকের দায়িত্ব পালন করেছে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। গ্রন্থটির জন্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচ্ছদ এঁকে দিয়ে একে বিশেষ মর্যাদা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন।
স্মারকগ্রন্থের শুরুতে স্থান পেয়েছে কবি ও গীতিকার আবু জাফরের কবিতা এবং শেষ প্রচ্ছদের স্থান পেয়েছে কবি আসাদ চৌধুরীর কবিতা। শুরু প্রবন্ধ ‘অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মরণে’ রচনাটি বাংলা লোকসাহিত্যচর্চায় তার পথিকৃৎ ভূমিকাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছে। মনীষী সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় রচিত ‘অধ্যাপক মনসুরউদ্দীন: হারামণি’ প্রবন্ধে তার সঙ্গে আজীবনের বন্ধুত্বের স্মৃতি ও লোকসাহিত্য সাধনার মূল্যায়ন ফুটে উঠেছে। মনসুরউদ্দীনের প্রধান কৃতিত্ব লোকসংগীত সংগ্রহ করে ‘হারামণি’র একাধিক খণ্ডে তা সংকলিত করা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি প্রায় সাড়ে চার হাজার লোকগীতি সংগ্রহ করেন। তার কাজকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ডক্টর আরনল্ড বাকের মতো দেশি-বিদেশি গুণিজন প্রশংসা ও সহায়তা করেছেন।
মনীষী প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফ রচিত ‘অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন’ নিবন্ধটিতে তার প্রিয় শিক্ষকের কর্মজীবন, সাহিত্যসাধনা ও বিরল ব্যক্তিত্বের চিত্র ধরা পড়েছে। রবীন্দ্রানুরাগী গবেষক রথীন্দ্রকান্ত ঘটকচৌধুরী রচিত ‘লোকসাহিত্যের ভুবনে মনসুরউদ্দীন ও কিছু স্মৃতি’ প্রবন্ধে তার লোকসংস্কৃতি-সাধনা, গবেষণা এবং রবীন্দ্র-অনুরাগের পরিচয় ফুটে উঠেছে। অধ্যাপক ড. আশরাফ সিদ্দিকী রচিত ‘আমাদের পিতৃপুরুষ মনসুরউদ্দীন’ প্রবন্ধে লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক অধ্যাপক মনসুরউদ্দীনের জীবন ও সাধনার সামগ্রিক রূপ তুলে ধরা হয়েছে।
তাকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সমকক্ষ উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. ওয়াকিল আহমদ বলেছেন, শহীদুল্লাহ যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা করে সাহিত্যচর্চার ভিত শক্ত করেছেন, অধ্যাপক মনসুরউদ্দীনও তেমনি লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে ফোকলোরচর্চার ভিত মজবুত করেছেন। ফোকলোরবিদ ড. সনৎকুমার মিত্র তাকে বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চার এক একনিষ্ঠ, তন্ময় ও অনন্য সাধক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ‘লোকসাহিত্যের এক বৃহৎ সাম্রাজ্যের দিকপাল’ এবং ‘অলিখিত জীবনের ভাষ্যকার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সংগীতজ্ঞ মোস্তফা জামান আব্বাসীর স্মৃতিপটে তিনি একাধারে শিক্ষক, পিতৃপ্রতিম মুরুব্বি ও স্নেহশীল অভিভাবক হিসেবে স্থান পেয়েছেন।
ছড়াকার ও ফোকলোরবিদ আতোয়ার রহমানের দৃষ্টিতে অধ্যাপক মনসুরউদ্দীন এমন এক ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব, যার অস্তিত্ব শুধু ভৌত দেহে সীমাবদ্ধ নয়, দেহাবসানের পরও তিনি এক প্রবহমান ধারার মতো বিরাজমান। ইতিহাসসন্ধানী গবেষক মোহিত রায়ের স্মৃতিকথায় তার অমায়িক, উদার, অনুসন্ধিৎসু ও আজীবন নিষ্ঠাবান ফোকলোরসাধকের চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইসলামি চিন্তাবিদ হাসান আব্দুল কাইয়ুমের বিশ্লেষণে তিনি গ্রাম-বাংলার লোকসংগীত ও অবহেলিত সাহিত্যমন্থনকারী এক অনন্য পথিকৃৎ। অধ্যাপক ড. কাজী আবদুল মান্নানের বিশ্লেষণে তার প্রধান স্বাতন্ত্র্য ছিল বাউলসাধকদের মতো একাকী পথচলা, কিন্তু তার হাতে একতারার পরিবর্তে ছিল কাগজ ও কলম।
ফোকলোরবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল করীম জানিয়েছেন, মনসুরউদ্দীন মনে করতেন, নিরক্ষর বাউল-ফকিররা বৈষম্যহীন মানবধর্ম ও সংস্কৃতির প্রকৃত সেবক; তাদের রচিত গানই আমাদের জাতীয় পরিচয় ও বেঁচে থাকার মূল প্রেরণা। ফোকলোরবিদ ড. খোন্দকার রিয়াজুল হক জানিয়েছেন, নিন্দা বা প্রশংসায় অবিচল থেকে তিনি গ্রামের পথ, কৃষকের উঠান, মাঝির নৌকা ও সাধকের আখড়া থেকে ফোকলোরের অমূল্য রত্নরাজি সংগ্রহ করেছেন।
আবুল আহসান চৌধুরীর ‘মনের মানুষ: মনসুরউদ্দীন’ প্রবন্ধের আলোকে অধ্যাপক মনসুরউদ্দীনকে ‘মনের মানুষ’ বলা অত্যন্ত যথার্থ ও যৌক্তিক। কবি ও প্রাবন্ধিক আবদুল মান্নান সৈয়দ রচিত ভূমিকা ও সাক্ষাৎকারে এই অধ্যাপকের জীবন ও ব্যক্তিত্বের এমন কিছু অজানা দিক ফুটে উঠেছে।
মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন কর্তৃক গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীকে লেখা পত্রাবলি যুক্ত হয়েছে গ্রন্থের শেষ রচনা হিসেবে। ত্রিশ বছর না পেরোনা তরুণ এই গবেষক-সম্পাদককে ১৭ খানা পত্র লিখেছেন! এই পত্রাবলি বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে অত্যন্ত অমূল্য দলিল। আবুল আহসান চৌধুরী তরুণ বয়সে এই সংকলনটি নিখুঁত ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদনা করে তার প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দুর্লভ পত্রাবলি, পাঠোদ্ধার এবং নির্ভুল ‘জীবনপঞ্জি’ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি নিজের দায়িত্বশীল সম্পাদনা-প্রতিভা ও লোকসংস্কৃতি গবেষণায় গভীর অনুরাগেরই স্ফুলিঙ্গ প্রকাশ করেছেন। এই বই কখনো পুরনো হয় না।







