ঝরাপাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাবা মারিউপোল থেকে ইংলিশ স্টাইলের কমোড নিয়ে এসেছে। ল্যাট্রিনের মেঝেটাও বাড়তি তক্তা দিয়ে মজবুত করা হলো। কাঠের দেয়ালে লাগানো হলো মাছি তাড়ানোর ওষুধ। জিনিসটার গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু মাছি দূরে রাখতে পারলে আমার তাতে আপত্তি নেই। বাবা ল্যাট্রিনের ভেতরেও একটা লাইট লাগিয়ে দিলো। সুইচটা থাকলো বাইরেই—যা বেশ সুবিধার। বাগানে পানি দেওয়ার লম্বা পাইপটা এতদূর টেনে এনে ফ্লাশে পানি ভরার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
আর মারিউপোল থেকে মা এনেছে ঘরের জন্য দরকারি টুকটাক জিনিসপত্র আর কিছু ফিতা ও কাপড়। বোঝা যাচ্ছে, দাচা গোছগাছ করা শেষ হলেই সে তার পোশাক অল্টার প্রকল্পে মন দেবে। নিজের শখের ভালো পোশাকগুলো আমার জন্য কেটে ছেঁটে ফিট করবে মা। এজন্য হাতে সময় আছে আর দুই সপ্তাহ। তারপরই বাবার সঙ্গে কিয়েভ যাবো আমি।
এই প্রায় পোড়ো গ্রামে আমাকে ছাড়া সাশা কী করবে তা ভেবে কুল পাচ্ছি না। দোনেৎস্কে ওর নিজের একটা ছোট্ট জগৎ ছিল। ছিল অনেক বন্ধু, খেলার মাঠ আর নিজের মতো ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতাও। কিন্তু এখানে ওর সমবয়সী ছেলেপেলে পাওয়ার আশা নেই বললেই চলে। আজকাল ইউক্রেনের গ্রামের বাসিন্দা বলতেই মূলত বুড়োবুড়ি আর তাদের পোষা কুকুর। বাকিরা প্রায় সব পাড়ি জমিয়েছে শহরে।
সমবয়সী বাচ্চাদের দেখা পেতে সাশাকে সম্ভবত পয়লা সেপ্টেম্বরের ‘প্রজ্ঞা দিবস’ পর্যন্তই অপেক্ষা করতে হবে। ইউক্রেনে এ দিবস এক বিশাল ব্যাপার—বাচ্চারা নিজের পছন্দমতো সাজগোজ করে শিক্ষকদের জন্য ফুল নিয়ে যায় স্কুলে। পরিবারের সদস্যদেরও সঙ্গে নেওয়া যায়। উদযাপনের শুরুতে সকালে 'ফার্স্ট বেল’ অনুষ্ঠান দিয়ে নতুন স্কুলবর্ষকে স্বাগত জানায় সবাই। বড় ক্লাসের ছেলেমেয়েরা ছোটদের সাহায্য করে অনুষ্ঠানটা করতে।
আমি খুব করে চাইছি সাশা যেন জলদি নতুন বন্ধু পেয়ে যায়। জায়গাটাকে যেন নিজের মনে করে নিতে পারে ও। তার আগে অবশ্য এখানকার হাই স্কুল কর্তৃপক্ষের ওকে ভর্তি নিতে রাজি হতে হবে। বাবা আর মা কালই কাউন্সিল আর কী একটা সরকারি অফিসে যাবে। সাশার স্কুলে ভর্তির সব কাজ সেরে আসার ইচ্ছা তাদের।
আজ সাশা আর আমি বেনিচকাকে নিয়ে মোবাইল নেট ভরতে গিয়ে ভলনোভাখা এলাকাটা ঘুরে দেখলাম। একটু ঘোরাঘুরি করতেই টিভি চ্যানেল আর ইন্টারনেটের মডেম ইনস্টল করার একটা দোকান পেয়ে গেলাম। বাবা কাল সকালে এখানে একবার ঢুঁ মারলে বিকেলের মধ্যেই টিভি আর ইন্টারনেট দুটোই চালু হয়ে যেতে পারে দাচায়।
মা আজকাল টাকা পয়সা খরচ করা নিয়ে খুঁতখুত করছে খুব। কিন্তু ইন্টারনেট ছাড়া কি আর এখন চলে! তাই শেষ পর্যন্ত সে এতে বাগড়া দেবে না বলেই মনে হয়।
আসল খরচ আসছে দুই সপ্তাহ পর - যখন বাবা আমাকে হলে তুলে দিয়ে আসার জন্য কিয়েভে নিয়ে যাবে। বাবা-মার সঞ্চয়ের যেটুকু বাকি আছে তার একটা বড় অংশ শুধু আমাকে একটু গুছিয়ে রেখে আসতেই চলে যাবে। ইদানিং ট্রেনের টিকিটের দামও এত বেড়েছে! শুধু যাতায়াতেই একগাদা টাকা বেরিয়ে যাবে।
এখান থেকে কিয়েভ যাওয়ার জন্য উপায় দুটো। একটা হচ্ছে তিনঘন্টার বাস জার্নি করে প্রথমে জাপোরিঝিয়া গিয়ে সেখান থেকে হাইস্পিড আন্তনগর ট্রেনে রাজধানী। এ পথে মোট লাগে ১১ ঘন্টার মতো। তবে খরচ অনেক। তুলনায় বেশ সস্তার কায়দাটা হচ্ছে মারিউপোল থেকে রাতের ট্রেন ধরা। তবে তাতে সময় লাগে অনেক -প্রায় ১৯ ঘন্টা। আমরা পরের পথই ধরবো বলে ঠিক করলাম। সময় বেশি লাগলেও বেশ কিছু পয়সা বাঁচবে এই দুঃসময়ে।
ইউক্রেনে আমার বয়সী বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই এমন দূরত্বে একাই চলাফেরা করে। যুদ্ধ না চললে বাবা হয়তো আমাকেও একাই যেতে দিতো। তাছাড়া আমি যে এখনো হুট করে দোনেৎস্ক ছেড়ে আসার ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারি নাই সেটা বাবা-মা দুজনেই জানে। এজন্য যতটা পারছে কাছে থাকছে আমার। কিয়েভেও আমাকে দেখে শুনে রাখার লোক ঠিক করা হয়েছে এরই মধ্যে! তারা হচ্ছে মা’র বন্ধু দাশা আন্টি আর তার স্বামী ভ্লাদ আঙ্কল।
মা’র ছোটবেলার বন্ধু দাশা আন্টির মতো মানুষ হয় না! উনাদের আদিবাড়ি দোনেৎস্কে। তবে এখন স্বামী আর তিন বাচ্চাকে নিয়ে কিয়েভে থাকেন।
ভ্লাদ আঙ্কল কাজ করেন একটা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠানে। উনি কিয়েভ সেন্ট্রাল রেলস্টেশনে এসে আমাদের রিসিভ করবেন বলে কথা হয়েছে। ওদের ফ্ল্যাটেই দুতিনদিন থাকবো আমরা। আমার কিমোর ছাত্রাবাসে ওঠার সব ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আর কী!
প্রথমদিন আঙ্কল ভ্লাদই বাবা আর আমাকে নিয়ে গেলেন কিমোতে। তার নাকি ঘন্টাদুয়েক দেরি হয়ে যাবে নিজের কাজে যেতে। তবে এ নিয়ে আঙ্কেলের খুব একটা বিকার দেখলাম না। অফিসের সুপারভাইজারের সঙ্গে নাকি তার বেশ খাতির। এ-ও জানা গেলো সেই ভদ্রলোকটি উগাণ্ডার মানুষ।
পরের দিন ভ্লাদ আঙ্কেলকে আর কষ্ট না দিয়ে আমি আর বাবা নিজেরাই গেলাম ক্যাম্পাসে। আগের দিনের বাকি থাকা কাজগুলো সেরে আমরা গেলাম এক ইলেকট্রনিক্সের দোকানে। দাদার দেওয়া টাকা দিয়ে একটা ল্যাপটপ কেনা হলো সেখান থেকে। তেমন দামি না হলেও ল্যাপটপটা দিয়ে আমার কাজ চলে যাবে। জিনিসটা পেয়ে ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফুটছিলাম আমি। এটাই আমার প্রথম একেবারে নিজের ল্যাপটপ যে! ঠিক করলাম, এখানে না, হলে গিয়ে তারিয়ে তারিয়ে বক্সটা খুলবো। অবশ্য দুয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে সেজন্য। তা লাগুক। এতদিন পর সত্যি সত্যি নিজের একটা ল্যাপটপ! চকচকে ব্র্যান্ড নিউ মেশিনটা প্যাকেট খুলে কীভাবে ছুঁয়ে দেখবো সেটা ভাবতেই খুশিতে কেমন যেন লাগছে আমার।
দিনচারেক পর বাবা দাচায় ফিরে গেল মারিউপোল হয়ে। আমি এর মধ্যে হলে উঠে গুছিয়ে নিয়েছি। ভর্তির ব্যবস্থাটা সেরে মাথা থেকে অনেক ভারি একটা বোঝা নেমে গেছে বাবার। নামবেই না বা কেন! আমরা হলাম বিচ্ছিন্নতাবাদী এলাকার মানুষ। ভর্তি হতে ঝামেলা হতে পারে বলে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিল মা-বাবা দুজনেই। কিন্তু সবকিছু এত ঝুটঝামেলা ছাড়াই হয়ে গেল যে আমরা দুজনেই তাজ্জব।
আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে হল একেবারেই কাছে। হাঁটলে মিনিটপাঁচেক। আরেকজনের সঙ্গে রুম শেয়ার করতে হবে আমাকে। আমার রুমমেট কাতিয়া। ও পড়ে সেকেন্ড ইয়ারে। কাতিয়ার আগের রুমমেট পড়াশোনার মাঝপথে বিয়ে করে ফেলেছে। অকালে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ডিপ্লোম্যাট স্বামীর সঙ্গে সে এখন জেনেভা থাকে।
হলে আমার রুমটা তিনতলায়। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, এখানে সব রুমের সঙ্গেই অ্যাটাচড বাথরুম আছে। খারকিভের ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া আমার দুই স্কুলের বন্ধুর কপাল অতো ভালো হয়নি। ওদের হলে সব ফ্লোরের এক মাথায় কমন বাথরুম। মানে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়। সকালের তাড়ার মধ্যে বাথরুমে যেতে আমাকে লাইন ধরতে হবে না এটা জেনে নিজেকে বেশ ভাগ্যবানই মনে হচ্ছিল।
রুমের ভেতরটা সাদামাটা হলেও ভদ্রস্থ। দুটো সিঙ্গেল খাট, দুটো ছোট পড়ার টেবিল আর চেয়ার, আর শীতের মোটা কোট রাখার মতো জায়গাসহ একটা বড় বিল্ট-ইন আলমারি। ঘরে একটাই জানালা, দরজার ঠিক উল্টোপাশে। রোজ সকালে সেই জানালা দিয়ে রোদের আলো ঢুকে ঘরটাকে যেন সমান করে ভাগ করে দেয়। অদৃশ্য এক সূক্ষ্ম রেখা টেনে দেয় দুজনের জিনিসপত্র এমনকি যেন দুটি জীবনের মাঝখানেও।
(চলবে)






