পঞ্চগড়ের ভিতরগড় ও পাথর জাদুঘরে

২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পুরাকীর্তি আর দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর ঘুরে এসে লিখেছেন শিমুল খালেদ
বেলা বাড়ার আগেই হোটেল থেকে চেকআউট সেরে তেঁতুলিয়া থেকে রওনা দিলাম পঞ্চগড় শহরের দিকে। জেলায় আমাদের দ্বিতীয় দিন এটি। ঘণ্টাখানেক যাত্রার পর বোর্ডবাজার এসে বাস থামলে নেমে পড়ি। যাব কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গনগরী ভিতরগড়। একটি অটোরিকশা ভাড়া করে রওনা দিলাম। তেঁতুলিয়াগামী রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে তারপর ডানে মোড় নিয়ে শুরু হয়েছে গ্রামীণ পথ।
দুইপাশে বাঁশবন, পাশে অমরখানা ইউনিয়ন লেখা ল্যান্ডমার্ক।
গড়ের উঁচু-নিচু পথ ধরে ভিতরগড়ের সীমায় প্রবেশ করলাম।
অটোচালক জানালেন, পুরো গড় ঘুরতে গেলে গোটা একটি দিন দরকার। পঞ্চগড় জেলাটি মূলত পাঁচটি গড়ের সমন্বয়, যার একটি হচ্ছে ভিতরগড়। এখানকার মহারাজার দীঘিতে আমরা পৌঁছালাম ভরদুপুরে। টিলাসদৃশ উঁচু পাড় দীঘির চারপাশ জুড়ে। পাড়ের ওপর দাঁড়ালাম যখন, চোখ তখন কপালে। ভাবছি বাকি সব বাদ, দীঘির চারপাশ শুধু ঘুরে আসতেই তো পুরো একটা দিন দরকার!
যদ্দূর জানা যায়, বিশালাকার এই দীঘি খনন করেছিলেন ভিতরগড়ের রাজা পৃথু। দীঘিতে ঘাট রয়েছে ১০টি। দীঘির পাড়ে পুরাকীর্তির লাল ইট চোখে পড়ল, এগুলো খননকাজের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা দীঘির পাড়ে কিছুক্ষণ ঘুরে তারপর অটোরিকশা নিয়ে ভিতরগড়ের পথ ধরে ঘুরতে বের হই।
ভিতরগড়ের সম্পূর্ণ এলাকার আয়তন প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার।
ভিতরগড় দুর্গের অভ্যন্তর অংশে প্রায় ২২টি প্রত্নতত্ত্বের জায়গার খোঁজ পাওয়া গেছে। এসব প্রত্নস্থল থেকে মাটি খনন করে বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধার করা হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদের ধারণা, দুর্গটি নির্মাণ করেছেন পৃথু রাজা এবং এটি ছিল তার রাজ্যের রাজধানী।
ঘুরতে ঘুরতে এরই মধ্যে দুপুর গড়িয়েছে। পেটের ভেতর ছুঁচো নাচছে। তাই আপাতত ঘোরাঘুরির ইস্তফা দিয়ে পঞ্চগড় শহরের পথ ধরি। পঞ্চগড়ের প্রায় সবখানে একটা জিনিস চোখে পড়ল, সেখানে চা পরিবেশন করা হয় গ্লাসে আর পানি দেওয়া হয় কাপে করে! ভিতরগড় থেকে পঞ্চগড় শহরে ফেরার পথে হাইওয়েতে এসে বোর্ডবাজারে বাহন থামিয়ে চা পান করতে গিয়ে সেটি আরেকবার খেয়াল করলাম। শহরের কাছাকাছি ফিরে আবার পেলাম করতোয়ার দেখা। ছোট নদী করতোয়া; পানি গোড়ালিসমান, তলদেশে চকচক করছে রুপালি বালু। আমাদের পরের গন্তব্য পঞ্চগড় রকস মিউজিয়াম। শহরে প্রবেশ করে তারপর একটা গলিপথের মুখে এসে অটোরিকশা ছেড়ে দিলাম। ভেতর হয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটির নাম মহিলা কলেজ রোড। এই রাস্তা ধরে মোটামুটি কিছুটা পথ গেলেই কলেজের ভেতর রকস মিউজিয়াম।
জাদুঘরের প্রবেশদ্বারের মুখেই সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন আকারের কিছু পাথরখণ্ড। জনপ্রতি ২০ টাকা করে টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেয়ালে আর তাকের ওপর শোভা পাচ্ছে নানা রঙ আর আকারের পাথর।
বাংলাদেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর এই রকস মিউজিয়াম। ১৯৯৭ সালে নিজের উদ্যোগে কলেজের অধ্যক্ষ নাজমুল হক জাদুঘরটি গড়ে তোলেন। হাজার বছরের পুরনো পাথর ছাড়াও এখানে প্রাচীন ইমারতের ইট, পোড়ামাটির বিভিন্ন ফলক ও মূর্তি সংরক্ষণ করা হয়েছে সযত্নে। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন যুগের শাসনামলের নানা নিদর্শন। দেয়ালে একটা কাঠের কারুকাজ করা মুখাবয়বের ভাস্কর্য চোখে পড়ল। অপলক দৃষ্টিতে চাহনি যেন জীবন্ত!
ঘুরে ঘুরে দেখছি জাদুঘরের চার দেয়ালের এসব নিদর্শন, তবে মন যেন চলে গেছে হাজার বছর আগে! নিথর প্রাণহীন এসব স্মৃতিচিহ্ন যেন হাজার বছরের ভাষা হয়ে মৌনতায় দাঁড়িয়ে আছে একরাশ কথা নিয়ে। স্কুলপড়ুয়া সাঁওতাল দুই বালিকাও এসেছে দর্শনার্থী হিসেবে। চোখেমুখে আনন্দের রেখা। সেই আনন্দ গায়ে মেখে বের হয়ে এলাম জাদুঘর থেকে।






