সৌরজগত পেরিয়ে অনন্তে মানুষের মহাকাব্যিক ভ্রমণ

ভয়েজার ১ বনাম ভয়েজার ২: প্রকৃতপক্ষে সৌরজগৎ অন্বেষণ করেছিল যারা
কল্পনার আছে সীমা লঙ্ঘনের শক্তি। ইতিবাচকভাবে বললে সীমা অতিক্রমের শক্তি। কিন্তু বস্তুত আক্ষরিক সীমা মানুষ ছাড়িয়ে যেতে পেরেছিল কবে?
ভয়েজার মিশনের দুই সহোদর মহাকাশযান, ভয়েজার ১ আর ভয়েজার ২। সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম করা মানুষের তৈরি সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তু এই রোবটদ্বয়। সূর্য ঘিরে আবর্তিত গোটা সৌরজগতের বাইরে পৌঁছানো মানবনির্মিত এই বস্তু আমাদের সবার বার্তা নিয়ে যাচ্ছে অসীমে। এ কথা ভাবলেই কেমন শিহরণ হয় যেন।
আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে ১৯৭৭ সালে শুরু হয় এই মহাকাব্যিক যাত্রা।
১৯৭৭ সালে নাসা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহাকাশ অভিযানের অংশ হিসেবে উৎক্ষেপণ করে দুটি মহাকাশযান; ভয়েজার ১ এবং ভয়েজার ২। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সৌরজগতের বাইরের বৃহৎ গ্রহগুলো কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা। গ্রহীয় পরিবেশ সম্পর্কে গভীর তথ্য সংগ্রহ করা এবং এমন এক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করা যা ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণা এগিয়ে নেবে আরও।
তখনকার সময়ের প্রযুক্তি ছিল সীমিত, কিন্তু বিজ্ঞানীদের কল্পনা ছিল সীমাহীন। তারা এমন একটি পরিকল্পনা করেন যেখানে গ্রহগুলোর বিরল অবস্থান কাজে লাগিয়ে এক গ্রহের মহাকর্ষ ব্যবহার করে পরবর্তী গ্রহে যাওয়ার পথ তৈরি করা যায়, যাকে বলা হয় গ্র্যাভিটি অ্যাসিস্ট।
এই কৌশলের কারণে ভয়েজার ২ আগে উৎক্ষেপণ হলেও ভয়েজার ১ দ্রুত গতিপথে এগিয়ে গিয়ে প্রথমে বৃহস্পতি ও পরে শনি অতিক্রম করে। অগ্রসর হয় সৌরজগতের বাইরের দিকে।
অন্যদিকে ভয়েজার ২ তুলনামূলক দীর্ঘ ও জটিল পথ অনুসরণ করে বৃহস্পতি ও শনি ছাড়া ইউরেনাস এবং নেপচুন পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়, যা আজ পর্যন্ত আর কোনো মহাকাশযান করতে পারেনি। এই চারটি গ্রহের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য আমাদের সৌরজগতের গঠন, গ্রহগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং চৌম্বকীয় ক্ষেত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন ধারণা দেয়।
বিশেষভাবে বৃহস্পতির উপগ্রহ আইওতে আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা আবিষ্কার করে ভয়েজার ১। যা ছিল সৌরজগতের বাইরে প্রথম বড় ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়। এছাড়া সর্বপ্রথম শনির বলয় এবং টাইটান উপগ্রহের ঘন বায়ুমণ্ডল এবং এর সম্ভাব্য জৈব রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এই তথ্য পরবর্তী সময়ে গ্রহবিজ্ঞান তথা গোটা মহাকাশ বিজ্ঞান চর্চায় নতুন গবেষণার দিগন্ত খুলে দেয়।
অপরদিকে ভয়েজার ২ ইউরেনাসের অদ্ভুতভাবে হেলে থাকা ঘূর্ণন অক্ষ এবং দুর্বল কিন্তু জটিল চৌম্বকক্ষেত্র সম্পর্কে জানায় আমাদের। এই জ্ঞান গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিদ্যা নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে বিজ্ঞানীদের। এছাড়া ভয়েজার ২ রেকর্ড করে নেপচুনের ভয়ংকর গতির বায়ুপ্রবাহ এবং বিশাল ঝড়। যেই জ্ঞান বিবেচিত হয় সৌরজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়াগত ঘটনা হিসেবে।
এই দুই মহাকাশযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, তাদের সঙ্গে বহন করা একটি গোল্ডেন রেকর্ড। এই একটি সোনালি আবরণযুক্ত ডিস্ক বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল লৌকিক যত চিহ্ন। পৃথিবীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ধারণ করা হয়েছিল এতে। ছিল বিভিন্ন ভাষায় শুভেচ্ছা বার্তা, ছিল প্রাকৃতিক শব্দ। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ, বাতাসের শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, ছিল পাখির ডাক। সংরক্ষিত আছে মানুষের হাসি-কান্নাও। এর পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন অঞ্চলের সংগীতও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এতে। অন্তর্ভুক্ত লুদভিগ ভ্যান বিটোফেন ও জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের মতো সুরকারদের রচনা। তাদের সৃষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মিউজিক পিস। গোল্ডেন রেকর্ডে স্থান পেয়েছে ভারতীয় ধ্রুপদী গায়িকা কেশরীবাঈ কেরকারের গাওয়া ভৈরবী রাগের বিখ্যাত বন্দিশ 'জাত কাহাঁ হো'। এই ডিস্কে রাখা হয়েছে এমন সব ছবি ও রেকর্ড, যা মানুষের সৃষ্টি, মানুষের আবেগ, প্রেম ও দুঃখ, জন্ম ও মৃত্যুর প্রতিনিধিত্ব করে।
ভয়েজার মিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এর ধারাবাহিকতা। উৎক্ষেপণের প্রায় চার দশক পরেও এই সহোদর মহাকাশযান দুটি তথ্য পাঠাচ্ছে সক্রিয়ভাবে। তবে ভেসে বেড়ানো অতি দূরত্বে অবস্থানকারী এই ভয়েজার দুটোর শক্তির উৎস রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ফলে একে একে কিছু যন্ত্রের ফাংশন বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে শক্তি সাশ্রয়ের জন্য। তবুও সীমিত শক্তির মধ্যে তারা আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিবেশ থেকে কণা, প্লাজমা এবং চৌম্বকক্ষেত্র সম্পর্কিত তথ্য পাঠাচ্ছে। তবে একসময় একটি ভয়েজার এতো দূরে পৌঁছে যায় যে, এর পাঠানো কিছু তথ্য কেবল ভুল বকা এলোমেলো বাইনারির মতো মনে করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। তবুও তা মানবজাতির জন্য অমূল্য এক তথ্য ভাণ্ডার।
২০১২ সালে ভয়েজার ১ এবং ২০১8 সালে ভয়েজার ২ মহাকাশের হেলিওপজ অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে প্রবেশ করে। এই সীমা হলো সেই অঞ্চল, যেখানে সূর্যের সৌরবায়ুর প্রভাব শেষ হয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যম শুরু হয়। এই অর্জনকে মানব ইতিহাসে প্রথম আন্তঃনাক্ষত্রিক পদচিহ্ন হিসেবে দেখা হয়। এই পর্যায়ে পৌঁছে আর সৌরজগতের অভ্যন্তরের অংশ নয়, বরং নক্ষত্রের মধ্যবর্তী বিশাল শূন্যতার অংশে প্রবেশ করেছিল তারা।
বর্তমানে পৃথিবী থেকে বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে এই দুই মহাকাশযান। তাদের পাঠানো সংকেত আলোর গতিতে চললেও পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় লাগে বহু ঘণ্টা। তবে ভবিষ্যতে তাদের শক্তি শেষ হবে একসময়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবে মানুষের সঙ্গে। পরবর্তী লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তখনও নীরবে মহাশূন্যে ভেসে চলবে তারা । কোনো গ্রহে ফিরে আসবে না, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব থাকবে মহাবিশ্বের ইতিহাসে একটি স্থায়ী বার্তা হিসেবে।
ভয়েজার ১ ও ২ কেবল প্রযুক্তির সাফল্য নয়। তারা মানব কৌতূহল, অনুসন্ধান এবং সীমা অতিক্রম করার মানসিকতার প্রতীক। এই দুই মহাকাশযান প্রমাণ করেছে যে, মানুষ নিজের পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে মহাবিশ্বের গভীরে পৌঁছাতে পারে। নিজের অস্তিত্বের চিহ্ন এমন জায়গায় রেখে যেতে পারে, যেখানে কোনো মানুষ কখনো পৌঁছাবে না। তাদের যাত্রা শেষ হয়নি এখনও। শেষ হবেওনা কখনও। বরং শুরু হয়েছে এক অনন্ত নীরব ভ্রমণ। কোটি বছর পরও চলতে থাকবে মহাকাব্যিক এই ভ্রমণ।







