চাঁদের বুকে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে ইলন মাস্কের রকেট

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
চাঁদ প্রতিনিয়ত মহাকাশ থেকে আসা নানা ধরনের বস্তুর আঘাতের মুখে পড়ে। তবে এবার যে ঘটনাটি সামনে এসেছে, তা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে কারণ এটি কোনো প্রাকৃতিক উল্কা নয়, বরং মানবসৃষ্ট একটি মহাকাশযানের অংশ। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট চাঁদের বুকে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের একটি ‘ফ্যালকন নাইন’ রকেটের বুস্টার।
এই পূর্বাভাস দিয়েছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী বিল গ্রে, যিনি নিয়ার আর্থ অবজেক্ট ট্র্যাক করার জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যার ‘প্রজেক্ট প্লুটো’ এর নির্মাতা। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রকেটের এই অংশটি ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট ০৬:৪৪ ইউটিসি সময়ে চাঁদের পৃষ্ঠে আঘাত করবে।
আঘাতের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে চাঁদের আইনস্টাইন ক্রেটার-এর কাছাকাছি একটি অঞ্চল। এর অবস্থান চাঁদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য অংশের সীমান্তে এবং বহু পুরোনো আঘাতে এরই মধ্যে স্থানটি ক্ষতবিক্ষত।
ফ্যালকন নাইন রকেটের অংশটি মূলত পৃথিবীর কক্ষপথে ব্যবহারের পর মহাকাশে ভেসে থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘ কক্ষপথগত পরিবর্তনের কারণে এটি এখন চাঁদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। রকেটটির উচ্চতা প্রায় ৭০ মিটার এবং ওজন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কিলোগ্রাম।
এই নির্দিষ্ট রকেট অংশটি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উৎক্ষেপিত একটি মিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। উৎক্ষেপণের পর এর দ্বিতীয় ধাপটি আলাদা হয়ে মহাকাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘুরতে থাকে এবং ধীরে ধীরে এমন একটি কক্ষপথে প্রবেশ করে যা চাঁদের কক্ষপথের সঙ্গে ছেদ করে।
বিল গ্রে ব্যাখ্যা করেছেন যে মহাকাশের বস্তুর গতি মূলত পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহের মহাকর্ষ দ্বারা নির্ধারিত হয়। এর হিসেব থাকে খুবই নির্ভুলভাবে হিসাব করা যায়। তবে একটি অতিরিক্ত প্রভাব রয়েছে- সূর্যালোকের চাপ, যা খুবই দুর্বল হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বস্তুটির গতিপথে পরিবর্তন আনতে পারে। এই কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কক্ষপথ সামান্য সরে গিয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছায় যেখানে সংঘর্ষ সম্ভব হয়ে ওঠে।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, রকেটটি প্রতি ২৬ দিনে একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে এবং এর কক্ষপথের একটি অংশ চাঁদের কক্ষপথের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সাধারণত এই ধরনের ছেদবিন্দুতে দুইটি বস্তু একসঙ্গে না পৌঁছানোর কারণে সংঘর্ষ হয় না, কিন্তু এবার সেই সমন্বয় ঘটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও চাঁদে মানবসৃষ্ট বস্তু আঘাত করেছে। ২০০৯ সালে নাসার এলসিআরওএসএস মিশন ইচ্ছাকৃতভাবে চাঁদে আঘাত করে পানির অস্তিত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছিল। এছাড়া অ্যাপোলো যুগেও বিভিন্ন রকেট অংশ চাঁদের পৃষ্ঠে ফেলা হয়েছিল গবেষণার উদ্দেশ্যে। ২০২২ সালেও একটি চীনা রকেট অংশ চাঁদের দূর পাশে আঘাত করে একটি নতুন গর্ত তৈরি করে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই নতুন সংঘর্ষে কোনো বাস্তব বিপদ নেই। চাঁদে কোনো মানুষ বা স্থাপনা নেই, তাই এটি নিরাপদভাবেই একটি বৈজ্ঞানিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এটি একটি বড় ক্রেটার তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তীতে চাঁদের পৃষ্ঠ নিয়ে গবেষণায় সহায়ক হতে পারে।
এই ঘটনার মাধ্যমে মহাকাশে জমে থাকা আবর্জনার সমস্যা আবারও সামনে এসেছে। অকার্যকর রকেট অংশ ও স্যাটেলাইট ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন মানব মিশন আবার চাঁদে ফিরতে শুরু করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের রকেটের উপরের অংশগুলোকে এমন কক্ষপথে পাঠানো উচিত যাতে তারা পৃথিবী-চাঁদের সিস্টেম থেকে বের হয়ে সূর্যের চারপাশে স্থিতিশীল অবস্থায় চলে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হবে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট




