প্রাণিজগৎ
মল থেকে উদরে মাঝে রানীর জীবন

কল্পনা করুন তো, এমন এক পরজীবী যদি আপনার পেটে ঢোকে, যা আপনার স্বাভাবিক বয়সের চেয়েও ১০ গুণ বেশি আয়ু দান করে! শুধু তাই নয়, আশপাশের সবাই আপনাকে একদম রানীর মতো চোখে চোখে রাখবে, সেবাযত্ন করবে। শুনতে দারুণ একটা ডিল মনে হচ্ছে না? এটি আসলে টেমোনোথর্যাক্স নাইল্যানডি প্রজাতির পিঁপড়ার বাস্তব জীবন।
সম্প্রতি ‘বিএমসি জিনোমিকস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা অবাক করা সব তথ্য প্রকাশ করেছেন।
সবকিছু শুরু হয় যখন পিঁপড়ার লার্ভা বা ছোট বাচ্চারা কাঠঠোকরা পাখির বিষ্ঠা খেয়ে ফেলে। এর মাধ্যমেই শরীরে প্রবেশ করে অ্যানোমোটেমিয়া ব্রেভিস নামে ফিতাকৃমির লার্ভা। ব্যস, শুরু হয়ে যায় এক গোলমেলে ও ধূর্ত চক্র!
আক্রান্ত হওয়ার পর পিঁপড়াগুলোর চেহারায় দারুণ সব পরিবর্তন আসে। তাদের গাঢ় বাদামি রঙটা ফ্যাকাশে হলুদ হতে শুরু করে এবং তারা অন্য পিঁপড়াদের মতো অত বড়ও হয় না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তারা এমন এক বিশেষ সুবাস বা গন্ধ ছড়াতে শুরু করে, যা দেখে অন্য সুস্থ শ্রমিক পিঁপড়ারা মনে করে— আরে, এ তো আমাদের রানী!
এরপর যা ঘটে তা দেখলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। উপনিবেশের বাকি শ্রমিক পিঁপড়ারা তখন সেই আক্রান্ত পিঁপড়াকে রানীর মতো সম্মান দেওয়া শুরু করে। তাদের জন্য সুস্বাদু খাবার হাজির করে, গায়ে আঁচড় পর্যন্ত লাগতে দেয় না, পরম যত্নে পরিষ্কার করে এবং আদর করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বয়ে বেড়ায়।
পরজীবী আক্রান্ত পিঁপড়ে এমন এক বিশেষ সুবাস ছড়ায়, অন্য পিঁপড়ারা মনে করে— আরে, এ তো রানী
এদিকে আমাদের হিরো পিঁপড়ারা দিব্যি সেই রাজকীয় লাইফস্টাইল উপভোগ করতে থাকে! ঘরের কোনো কাজকর্মে তাদের আর পাওয়া যায় না। সারা জীবন কোনো কষ্ট না করে, কোনো কাজ না করে আরামে দিন কাটায় আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম সাধারণ শ্রমিক পিঁপড়ারা তাদের সব আবদার মেটাতে ব্যস্ত থাকে।
কথায় বলে সস্তার তিন অবস্থা।
ফিতাকৃমির লার্ভাগুলোর আসল উদ্দেশ্য হলো পিঁপড়াকে একদম অলস ও পঙ্গু করে রাখা, যাতে বিশাল কোনো শিকারির পেটে খুব সহজে যাওয়া যায়। একসময় যখন কোনো কাঠঠোকরা পাখি এসে হাজির হয়, তখন বাকি সুস্থ পিঁপড়ারা জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়ে গেলেও এই রাজকীয় মেজাজে থাকা অলস পিঁপড়ারা নির্বিকার বোকার মতো বসে থাকে। ফলে পাখির কাছে তারা হয়ে ওঠে একদম সুস্বাদু ও সহজ স্ন্যাকস!
পাখির পেটে পৌঁছানোর পর ফিতাকৃমিগুলো তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে যায়। সেখানে তারা বড় হয়, বংশবৃদ্ধি করে এবং ডিম পাড়ে। এরপর পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে সেই ডিম আবার মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং এভাবেই চলতে থাকে প্রকৃতির এই অদ্ভুত সার্কেল অব লাইফ।




