কোয়ান্টাম কম্পিউটারই ভবিষ্যৎ

কোয়ান্টাম কম্পিউটার পর্যবেক্ষণ করছেন সুন্দর পিচাই (বামে)
মানবজাতির যাবতীয় সমস্যার সমাধানের চাবিই যেন কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। লিখেছেন শুভ রহমান
জটিল এক গাণিতিক সমস্যা। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের এটি সমাধান করতে লাগবে ১ সেপ্টিলিয়ন বছর, অর্থাৎ এক সংখ্যার পেছনে ২৫ শূন্য লাগালে যে সংখ্যা হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, মহাবিশ্বের বয়সও এত নয়। আর এই সমস্যার সমাধান করে দেখিয়েছে প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যালফাবেটের কোয়ান্টাম কম্পিউটার উইলো।
শুধু গাণিতিক সমস্যাই নয়; ক্যানসার, কিংবা নতুন কোনো মহামারীতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কার করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করতে হয়। একটি কার্যকর ওষুধ তৈরির জন্য কোটি কোটি রাসায়নিক অণুর পারস্পরিক জটিল বিক্রিয়া পরীক্ষা করতে বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারগুলোরও কয়েক দশক বা শত শত বছর সময় লেগে যেতে পারে।
এই গাণিতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বহু চিকিৎসাসেবা আলোর মুখ দেখে না এবং কোটি কোটি মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়। উইলোর মতো নতুন ও রোমাঞ্চকর কোয়ান্টাম প্রযুক্তির কারণে মানবজাতি এখন এমন এক সময়ের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে আছে, যা এই আপাত অসাধ্যকে চোখের পলকে সম্ভব করবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মানবজাতির সবচেয়ে বড় বড় সমস্যাকে নিমেষে সমাধান করে দেবে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কারণেই জটিল রাসায়নিক অণুর মিথস্ক্রিয়া মাত্র কয়েক মিনিটে সিমুলেট করা সম্ভব হবে
আমাদের হাতের স্মার্টফোন কিংবা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ট্র্যাডিশনাল সুপারকম্পিউটারগুলো মূলত বাইনারি বা বিট পদ্ধতিতে কাজ করে। এটি যেকোনো তথ্যকে শুধু শূন্য অথবা এক হিসেবে প্রসেস করে। অন্যদিকে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার কাজ করে কিউবিট বা কোয়ান্টাম বিটের মাধ্যমে। কোয়ান্টাম মেকানিকসের দুটি মূল নীতি— সুপারপজিশন ও এনট্যাঙ্গেলমেন্টের ওপর ভিত্তি করে এই কিউবিট পরিচালিত হয়। সুপারপজিশনের কারণে একটি কিউবিট একই সঙ্গে শূন্য এবং এক উভয় অবস্থাতেই থাকতে পারে। ফলে যেখানে একটি সাধারণ কম্পিউটারকে যেকোনো জটিল হিসাবের সব সম্ভাবনা একে একে পরীক্ষা করতে হয়, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সঙ্গে কোটি কোটি সম্ভাবনা এক সেকেন্ডে হিসাব করে ফেলতে পারে।
এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কারণেই জটিল রাসায়নিক অণুর মিথস্ক্রিয়া মাত্র কয়েক মিনিটে সিমুলেট করা সম্ভব হবে, যা ওষুধ আবিষ্কারের চিরাচরিত দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে চিরতরে বদলে দেবে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি আমূল পরিবর্তন আনবে।
একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের ব্যাংক এনক্রিপশন বা ব্লকচেইন প্রযুক্তি যে ডিজিটাল সিকিউরিটি কোডের ওপর ভিত্তি করে সুরক্ষিত, শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তা নিমেষে ভেঙে ফেলতে সক্ষম। এ কারণে বিশ্ব জুড়ে এখন থেকেই কোয়ান্টাম-প্রতিরোধী বা পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির গবেষণা শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসের জন্য বাতাসে কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি উন্নত করা, আরও সাশ্রয়ী ব্যাটারি তৈরি এবং বিদ্যুতের অপচয় শূন্যে নামিয়ে আনতে নতুন ধরনের সুপারকনডাক্টর উপাদান তৈরিতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। দীর্ঘদিনের ট্রাফিক জ্যামের জটলা খোলা কিংবা বৈশ্বিক লজিস্টিকস বা আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়ার মতো জটিল কাজগুলো তখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হবে।
এত সম্ভাবনার পরও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কিছু বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। এর কিউবিটগুলো চারপাশের পরিবেশের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সামান্য তাপমাত্রা পরিবর্তন বা বাইরের সামান্য কম্পনেই এরা তাদের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ডিকোহেরেন্স বলা হয়।
এই জটিল ত্রুটি এড়াতে কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলোকে নিখুঁতভাবে সচল রাখতে পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি, অর্থাৎ মাইনাস ২৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো অত্যন্ত শীতল পরিবেশে রাখতে হয়। তবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা এবং বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের কারণে এ কোয়ান্টাম ত্রুটি বা এরর সংশোধনের প্রযুক্তি এখন রকেট গতিতে এগোচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এমন বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার সবার জন্য উন্মুক্ত হবে, যা শিল্পক্ষেত্রে সরাসরি বড় বড় সমস্যার সমাধান করতে পারবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার কেবল বর্তমান কম্পিউটারের কোনো উন্নত সংস্করণ নয়; এটি মানবসভ্যতার সম্পূর্ণ নতুন এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, যা একসময় মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল।গ




