ফিরছে জিটিএ যুগ, কাউন্টডাউন শুরু

জিটিএ-৬ এর কভার আর্ট। ছবি: রকস্টার গেমস
একটা সময় ছিল, স্কুল বা কলেজ শেষে বন্ধুদের সঙ্গে সাইবার ক্যাফেতে ছুটে যাওয়া, কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ভার্চুয়াল শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো আর মিশনের পর মিশন শেষ করার মধ্যেই লুকিয়ে থাকত এক অন্যরকম আনন্দ। সেই স্মৃতির নাম ছিল গ্র্যান্ড থেফট অটো বা জিটিএ। নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে দুই হাজারের দশকজুড়ে বিশ্বের কোটি কোটি তরুণের গেমিং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এই সিরিজ আবারও ফিরছে নতুন অধ্যায় নিয়ে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রকস্টার গেমস ঘোষণা করেছে, বহুল আলোচিত গ্র্যান্ড থেফট অটো-৬ বা জিটিএ-৬ এর প্রি-অর্ডার শুরু হবে আগামী ২৫ জুন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে আধুনিক গেমিং ইতিহাসের অন্যতম বড় এক প্রত্যাবর্তনের কাউন্টডাউন।
রকস্টারের ঘোষণা অনুযায়ী, প্লেস্টেশন স্টোরসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং নির্বাচিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে গেমটির প্রি-অর্ডার করা যাবে। বহু প্রতীক্ষিত এই গেমটি আগামী ১৯ নভেম্বর প্লেস্টেশন ৫ এবং এক্সবক্স সিরিজ এক্স/এসের জন্য বাজারে আসবে। মূলত ২০২৫ সালের শরতে মুক্তির পরিকল্পনা থাকলেও উন্নয়ন কাজের কারণে দুই দফা পিছিয়ে দেওয়া হয় প্রকাশের তারিখ। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে নির্দিষ্ট মুক্তির দিন পেয়ে উচ্ছ্বসিত গেমাররা।
প্রি-অর্ডার ঘোষণার পাশাপাশি প্রকাশ করা হয়েছে জিটিএ-৬ এর আনুষ্ঠানিক কভার আর্ট। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে উন্মোচিত এই কভারে দেখা যায় গেমটির দুই প্রধান চরিত্র জেসন ও লুসিয়াকে। তাদের ঘিরে রয়েছে নতুন বিশ্বের নানা উপাদান। কাল্পনিক অঙ্গরাজ্য লিওনিডার মনোরম পরিবেশ, ফ্লেমিঙ্গো, অ্যালিগেটর, সমুদ্রতীর, ঝলমলে নগরজীবন, দ্রুতগতির স্পোর্টস কার, মোটরবাইক এবং হেলিকপ্টারের উপস্থিতি কভারটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
রকস্টারের স্বাক্ষরধর্মী রঙিন পপ-আর্ট শৈলীতে তৈরি এই প্রচ্ছদ ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
তবে এখনো একটি বড় প্রশ্নের উত্তর মেলেনি- কত দাম হতে পারে জিটিএ- ৬ এর?
রকস্টার এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তবু গেমিং দুনিয়ায় এ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। শিল্প বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এপিলিয়নের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, এর মূল্য ১০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে এটি মূলধারার গেমিং বাজারে নতুন মূল্যমান নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জিটিএ সিরিজের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। শুরুতে ওপর থেকে দেখা ছোট আকারের অ্যাকশন গেম হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও খুব দ্রুতই এটি গেমিং শিল্পে বিপ্লব ঘটায়। ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া জিটিএ-৩ প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত বিশ্বের থ্রিডি গেমপ্লে এনে পুরো শিল্পকে নতুন পথে নিয়ে যায়। এরপর ২০০২ সালে আসে ভাইস সিটি, যা আশির দশকের আমেরিকান সংস্কৃতি, সংগীত ও অপরাধ জগতের গল্পের কারণে আজও ভক্তদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তবে সিরিজটির জনপ্রিয়তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় ২০০৪ সালে প্রকাশিত জিটিএ: সান আন্দ্রেয়াস। কার্ল জনসন বা সিজে চরিত্রটি শুধু একটি ভিডিও গেমের নায়ক নয়, বরং একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। বিশাল মানচিত্র, অসংখ্য মিশন, চরিত্র উন্নয়নের সুযোগ এবং অভূতপূর্ব স্বাধীনতার কারণে সান আন্দ্রেয়াসকে এখনো অনেক গেমার সিরিজের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী গেম হিসেবে বিবেচনা করেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জিটিএ মানেই অনেকের কাছে এখনো সান আন্দ্রেয়াস।
এরপর ২০০৮ সালে আসে জিটিএ-৪, যা বাস্তবধর্মী গল্প ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সিরিজকে আরও পরিণত রূপ দেয়। কিন্তু সব রেকর্ড ভেঙে দেয় ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া জিটিএ-৫।
তিন প্রধান চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই গেম মুক্তির পরপরই বৈশ্বিক সাফল্য অর্জন করে। এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এর জনপ্রিয়তা কমেনি। অনলাইন সংস্করণ জিটিএ অনলাইনের কারণে গেমটি এখনো লাখো খেলোয়াড়ের নিয়মিত গন্তব্য। ২১ কোটিরও বেশি কপি বিক্রির মাধ্যমে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক বিক্রিত ভিডিও গেমে পরিণত হয়েছে, যা জিটিএ- ৫ কে সিরিজের বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে সফল গেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জিটিএ ৬-কে ঘিরে প্রত্যাশার অন্যতম কারণ হলো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নতুন প্রজন্মের কনসোলের সক্ষমতা। এবার প্রথমবারের মতো সিরিজটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে থাকছে লুসিয়া নামের এক নারী নায়িকা। তার সঙ্গে জেসনের সম্পর্ক এবং অপরাধ জগতের গল্পকে ঘিরেই এগোবে কাহিনি। ২০২৩ ও ২০২৫ সালে প্রকাশিত দুটি ট্রেলার ইতোমধ্যে সম্মিলিতভাবে ৪৪ কোটি বারেরও বেশি ভিউ অর্জন করেছে, যা ভিডিও গেম ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
এক যুগেরও বেশি সময় পর নতুন জিটিএ নিয়ে ফিরছে রকস্টার। যারা ভাইস সিটির আলোঝলমলে রাস্তায় ঘুরেছেন, সান আন্দ্রেয়াসে সিজের সঙ্গে দৌড়েছেন কিংবা লস সান্তোসে অসংখ্য রাত কাটিয়েছেন, তাদের জন্য এটি শুধু আরেকটি গেম নয়; এটি ফিরে পাওয়া এক টুকরো শৈশব, একরাশ স্মৃতি এবং নতুন এক অভিযানের প্রতিশ্রুতি। তাই ২৫ জুনের প্রি-অর্ডার আর ১৯ নভেম্বরের মুক্তির দিনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে গেমারদের উন্মাদনা এখন তুঙ্গে।
অনেকের কাছে সত্যিই মনে হচ্ছে- ফিরছে জিটিএ যুগ।







