চাঁদের বুকে অচিরেই মানব বসতি
- আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে মানুষ আবার চাঁদের পথে ফিরছে, তবে লক্ষ্য অনেক বড়। চাঁদে ঘাঁটি তৈরি করা, তারপর মঙ্গলগ্রহের দিকে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া। লিখেছেন জেমাম আহমেদ

আর্টেমিস-২ মিশনের চার মহাকাশচারী
‘মহাকাশ থেকে আমাদের সুন্দর এই পৃথিবীকে দেখাটা এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি। তবে এবার আমাদের চোখ আরও দূরে, চাঁদের দিকে।’ আর্টেমিস-২ মিশনের পাইলট এবং চন্দ্রাভিযানের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহাকাশচারী ভিক্টর গলোভার-এর এই রোমাঞ্চকর কথাগুলো যেন মানবজাতির নতুন এক মহাকাশ যুগের ঘোষণা।
একসময় মানুষ চাঁদে গিয়েছিল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে। এখন মানুষ আবার চাঁদের পথে ফিরছে, তবে লক্ষ্য অনেক বড়। শুধু পতাকা গেড়ে ফিরে আসা নয়, বরং চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা, সেখান থেকে আরও দূরে মঙ্গলগ্রহের দিকে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া।
১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখার পর পৃথিবী যেন থমকে গিয়েছিল। সেটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার সময়। কিন্তু অর্ধশতাব্দী পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন চাঁদ আর কেবল রাজনৈতিক প্রতীকের নাম নয়, এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ সভ্যতার প্রথম সোপান।
আর্টেমিস-৩ মিশনে বহু বছর পর আবার মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রাখবে
এ স্বপ্ন নিয়েই মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা শুরু করেছে ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচি। গ্রিক পুরাণের চন্দ্রদেবী ও অ্যাপোলোর যমজ বোন ‘আর্টেমিস’-এর নামে নাসা সাজিয়েছে এ উচ্চাভিলাষী মহাকাশ প্রকল্প। এ নামকরণের সার্থকতা শুধু চাঁদে প্রথম নারী মহাকাশচারী পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার এক ‘আন্তঃগ্রহ প্রজাতি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের সংকল্প। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা, জাপানের জাক্সা এবং কানাডার সিএসএ-এর এক সমন্বিত প্রয়াস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও মহাকাশচারীরা যেন একসঙ্গে নতুন এক মহাকাশ ইতিহাস লিখছেন।
তবে এত বড় স্বপ্নের আগে দরকার ছিল প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতির প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল আর্টেমিস-১। ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর গভীর রাতের আকাশ কাঁপিয়ে মহাকাশে ছুটে যায় মানবজাতির সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটগুলোর একটি, ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস। তার মাথায় বসানো ছিল ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান।
এটি সম্পূর্ণ মানবহীন মিশন। কিন্তু পুরো যাত্রাটিই ছিল ভবিষ্যতের মানব অভিযানের মহড়া।
এরপর আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর্টেমিস-২। আর্টেমিস-২ মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানের সক্ষমতা মানুষের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করা। এই ঐতিহাসিক মিশনে অংশ নিয়েছেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গলোভার, মিশন স্পেশালিস্ট চাঁদের অভিমুখে যাত্রা করা প্রথম নারী ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। আর্টেমিস-২ সরাসরি চাঁদে অবতরণ করেনি। বরং এটি ছিল এক দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত মহাকাশ ভ্রমণপথ, যাকে বলা হয় ‘হাইব্রিড ফ্রি রিটার্ন ট্রাজেক্টরি’।
২০৩০-এর দশকের শুরুতে আর্টেমিস-৫ মিশনের মাধ্যমে শুরু হবে চন্দ্রপৃষ্ঠে একটি স্থায়ী বেস ক্যাম্প স্থাপনের কাজ
পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণের পর মহাকাশযানটি ‘ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন’-এর মাধ্যমে চাঁদের দিকে ছুটে যায়। তারপর চাঁদের পেছন দিক ঘুরে সেটি আবার পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের সাহায্যে ফিরে আসে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে পরবর্তী ধাপ হবে আর্টেমিস-৩। সে মিশনেই বহু বছর পর আবার মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রাখবে। শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য নয়, ভবিষ্যতে হয়তো সপ্তাহ, মাস এমনকি স্থায়ীভাবেও।
আর্টেমিস-৩ কে চাঁদের বুকে প্রত্যাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এবারের গন্তব্য অ্যাপোলোর মতো চাঁদের বিষুবরেখায় নয়, বরং দক্ষিণ মেরুর এক রহস্যময় অঞ্চলে। এ অঞ্চলের ছায়াবৃত গহ্বরগুলোতে থাকা জমাটবদ্ধ বরফের সন্ধান করাই এর মূল লক্ষ্য।
এ বরফ থেকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করে রকেটের জ্বালানি তৈরি করা হবে, যা চাঁদকে একটি ‘ফুয়েলিং স্টেশন’-এ পরিণত করবে এবং মহাকাশ অভিযানের খরচ কমাবে। এ মিশনে স্পেসএক্স-এর ‘স্টারশিপ’ ল্যান্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং মহাকাশচারীরা প্রায় এক সপ্তাহ চাঁদের বুকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালাবেন।
পরবর্তী ধাপে, আর্টেমিস-৪ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের কক্ষপথে ‘লুনার গেটওয়ে’ নামক একটি ছোট মহাকাশ স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। গভীর মহাকাশ অভিযানের ‘ডকিং হাব’ হিসেবে কাজ করবে। এরপর ২০৩০-এর দশকের শুরুতে আর্টেমিস-৫ মিশনের মাধ্যমে পাঠানো হবে উন্নত ‘লুনার টেরেইন ভেহিকেল’ এবং শুরু হবে একটি স্থায়ী বেস ক্যাম্প স্থাপনের কাজ। চন্দ্রপৃষ্ঠে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সেখানে উন্নত পারমাণবিক ফিশন সিস্টেমের ব্যবহার হতে পারে।
আর্টেমিস মিশন শুধু বিজ্ঞানের সীমানায় আটকে নেই, এটি মূলত এক নতুন বৈশ্বিক ‘লুনার ইকোনমি’ বা চন্দ্র-অর্থনীতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মহাকাশভিত্তিক এ অর্থনীতি ২০৪০ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিনের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মহাকাশ বাণিজ্যের প্রধান অংশীদার।







