নীহার বানু হত্যাকাণ্ড

আঁকা: সোহানুর রহমান
শুধু প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় নির্মমভাবে খুন হতে হয় শহীদ পরিবারের মেয়ে নীহার বানুকে। অর্ধশতাব্দী আগের সেই হত্যাকাণ্ড নিয়ে লিখেছেন ইমরানুর রহমান
১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। বাংলাদেশে চারদিকে তখনো যুদ্ধের ক্ষত। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠার সেই ক্রান্তিলগ্নে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এক নৃশংস ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্রী নীহার বানু। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম আলোচিত অরাজনৈতিক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, যা আজও শিহরন জাগায়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন নীহার বানুর বাবা নজীবুর রহমান। তিনি ছিলেন রাজশাহী কো-অপারেটিভ অফিসের সহকারী রেজিস্ট্রার। রেখে গিয়েছিলেন বিধবা স্ত্রী এবং পাঁচ সন্তান। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন নীহার বানু। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেছিলেন নীহারের বড় বোন চিকিৎসক মঞ্জিলা বেগম। পরিবারের ওপর নেমে আসা সেই শোক কাটিয়ে যখন তারা একটু স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন, তখনই এই হঠাৎ বজ্রপাত।
বাবু আরও শক্ত করে শাড়ি দিয়ে গলা চেপে ধরেন। শ্বাসরোধ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন নীহার
২৭ জানুয়ারি সকালে যথারীতি বাসা থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ক্লাসের উদ্দেশে রওনা হন নীহার বানু। কিন্তু সেদিন আর তিনি ফেরেননি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলেও মেয়ের দেখা না পেয়ে বিধবা মায়ের মনে জন্ম নেয় চরম আশঙ্কা। বড় বোন ডা. মঞ্জিলা বেগম ডিউটি শেষে বাড়ি ফিরে ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন নীহারের খোঁজ। কিন্তু নীহার যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা ও সহপাঠীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী জানা যায়, সকালে তিনি ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন।
বাবু নীহারকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। নীহার তা প্রত্যাখ্যান করে জানান তিনি বাবুকে ভাইয়ের মতো দেখেন
এবার একটু পেছনের দিকে দৃষ্টি দিই। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার আগে হাম হওয়ায় নীহারের প্রস্তুতি খুব খারাপ ছিল। নোট ও সাজেশনের জন্য তিনি যোগাযোগ করেন একই বিভাগের ছাত্র আহমেদ হোসেন বাবুর সঙ্গে। শিক্ষকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে সমীহ করতেন। এরপর থেকেই বাবুর সঙ্গে নীহার ও তার পরিবারের সুসম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে বাবু নীহারের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন এবং বিয়ের প্রস্তাব দেন। নীহার তা প্রত্যাখ্যান করে জানান বাবুকে ভাইয়ের বেশি কিছু ভাবেন না। বাবু আবার প্রস্তাব দেন, নীহার প্রত্যাখ্যান করেন আর বাবু নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে বোন ডাকার ভান করেন।
আসলে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আক্রোশে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন বাবু। ১৯৭৬ সালের ২৩ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের একটি কক্ষে বৈঠক করেন তিনি। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র এনামুল হক, বাবুর সহপাঠী আহসানুল হক এবং বিভাগের ছোট ভাই শহীদুল ইসলাম নীলু। সেদিনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ২৫ জানুয়ারি কোনো অজুহাতে নীহারকে দাওয়াত খাওয়ার নাম করে মিনা মঞ্জিল নামের একটি ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে বাবুর সঙ্গে। মামলার রাজসাক্ষী এনামুলের জবানবন্দি অনুযায়ী, নীহারের অন্যত্র বিয়ের কথাবার্তা পাকাপাকি হওয়ার খবর শুনে বাবু দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু ২৫ জানুয়ারি নীহার সারদায় বিভাগের পিকনিকে চলে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এরপর ২৬ জানুয়ারি লতিফ হলে আবার বৈঠক বসে। সিদ্ধান্ত হয়, যেকোনো মূল্যে নীহারকে মিনা মঞ্জিলে এনে বিয়েতে বাধ্য করা হবে। আর রাজি না হলে তাকে শেষ করে দেওয়া হবে।
আহমেদ হোসেন বাবু, আহসানুল হক এবং শহীদুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত
১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারি দুপুরে বাবু ও নীহার আলাদা দুটি রিকশায় করে মিনা মঞ্জিলে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন এনামুল, আহসানুল এবং শহীদুল ইসলাম নীলু। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে বাবু নীহারকে আবারও বিয়ের প্রস্তাব দেন। নীহার ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, আপনার সঙ্গে আমার ভাইবোনের সম্পর্ক। আবার যদি ও কথা বলেন, আমি চিৎকার করব। কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নীহারের পরনের শাড়ির আঁচল দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরেন বাবু। একপর্যায়ে বাঁচার শেষ চেষ্টায় বাবুর হাতে কামড় বসিয়ে দেন নীহার। তখন এনামুল, আহসানুল ও শহীদুল মিলে নীহারের হাত চেপে ধরে রাখেন। বাবু আরও শক্ত করে শাড়ি দিয়ে গলা চেপে ধরেন। শ্বাসরোধ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন নীহার। রাজসাক্ষী এনামুলের বর্ণনায় সেদিন নীহারের পরনে ছিল খয়েরি রঙের চেক শাড়ি, বাটার হাই-হিল স্যান্ডেল, নীল কোট, হলুদ ব্লাউজ, কালো পেটিকোট এবং বাম হাতে ঘড়ি। তার চুল লম্বা বেণি করা ছিল, গলায় ছিল চারকোনা রুপার তাবিজ এবং কানে ছোট দুল।
হত্যার পর লাশ সরানোর পরিকল্পনা করা হয়। মিনা মঞ্জিলের দক্ষিণ দেয়ালের কাছে বাথরুমের সামনে খালি উঠানে পুঁতে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। পরিহিত পোশাকসহ তাকে গর্তে শুইয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এরপর ওপরে আবর্জনা দিয়ে ঢেকে সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করে দেওয়া হয় স্থানটি। তারপর সবাই যে যার মতো হলে ফিরে যান। হলের রুমে ফিরে আসার পর বাবুর রুমমেট মো. রশীদুজ্জামান দেখেন বাবু অত্যন্ত ভীত ও বিমর্ষ। ২৮ জানুয়ারি রাতে কাপড়চোপড় গোছানোর সময় রশীদুজ্জামান বাবুকে জানান যে, নীহারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং তার স্বজনরা তাকে খুঁজতে এসেছেন। তখন বাবু বললেন, ‘আমি ঢাকায় চাকরি পেয়েছি। সেখানেই চলে যাচ্ছি।’ রাতেই তিনি পালিয়ে যান।
এদিকে নীহারের পরিবার যখন মরিয়া হয়ে তাকে খুঁজছে, তখন বাবুর সহপাঠী মিন্টুর আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ তাকে আটক করে। অন্যদিকে, নীহারের সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় তার কামড় খাওয়া সেতু চিকিৎসকের কাছে গিয়ে কুকুরের কামড় বলে চিকিৎসা নিতে চান। চিকিৎসক মানুষের দাঁতের কামড় বুঝতে পেরে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়ে দেন। সেতুকে আটকের পর তার এবং মিন্টুর জবানবন্দিতে একে একে শহীদুল ও এনামুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। অবশেষে হত্যার প্রায় সাড়ে চার মাস পর মিনা মঞ্জিলের সেই প্লাস্টার খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় নীহার বানুর কঙ্কালসার দেহ।
১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে উত্তরাঞ্চলের একমাত্র বিশেষ সামরিক আদালতে এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। মামলার স্বার্থে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে অন্যতম আসামি এনামুল হককে ক্ষমা ঘোষণা করে রাজসাক্ষী করা হয়। ১৯৭৭ সালের ২৯ আগস্ট তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ সালাম ৪০ পৃষ্ঠার এক রায়ে এ হত্যাকাণ্ডকে সমাজকে নাড়িয়ে দেওয়া অপরাধ বলে উল্লেখ করেন। আদালত রায় ঘোষণা করে প্রধান আসামি আহমেদ হোসেন বাবু, আহসানুল হক এবং শহীদুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে প্রধান আসামি আহমেদ হোসেন বাবু দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং আর ফেরেননি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি পরবর্তী সময়ে জার্মানিতে বসবাস শুরু করেন এবং তার দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।







