অত্যাচারী পুরুষের প্রাণ যেত অ্যাকোয়া টোফানায়

মধ্যযুগে পুরুষদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে ভয়াবহ এক পথ বেছে নিয়েছিলেন ইতালির রোমের বিবাহিত নারীরা। লিখেছেন সিরাজাম মুনিরা
১৬৫০ সালের রোম। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে গোটা শহর যখন হাঁসফাঁস করছে, তখন স্প্যানিশ স্কয়ারের এক অন্ধকার গলির পেছনে নিভৃত এক ঘরে জ্বলছিল মোমবাতি। ঘরের বাতাসে এক অদ্ভুত, মিষ্ট গন্ধ—গোলাপজলের সুবাসের নিচে ঢাকা পড়েছে ড্যাডলি নাইটশেডের হালকা তেতো গন্ধ। টেবিলের ওপর রাখা কাচের পাত্রে সাবধানে এক ফোঁটা স্বচ্ছ তরল মিশিয়ে দিচ্ছিলেন মধ্যবয়সী নারী জুলিয়া টোফানা। দেখতে অতি সাধারণ এক রূপচর্চার পাত্র, লেবেলে আঁকা সেন্ট নিকোলাসের পবিত্র ছবি। কিন্তু এই স্বচ্ছ, স্ফটিকের মতো তরলই ছিল সেই সময়ের রোমের সবচেয়ে গোপন ও শক্তিশালী ঘাতক— অ্যাকোয়া টোফানা।
সেই যুগে রোমের নারীদের জীবন ছিল নরকতুল্য। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিকলে বাঁধা পড়ে অনেক তরুণীকে যেতে হতো অত্যাচারী, মাতাল স্বামীদের ঘরে। বিয়েবিচ্ছেদের কোনো আইনি অধিকার ছিল না। ঠিক সেখানেই আড়ালে দাঁড়িয়ে মুক্তির পথ দেখাতেন জুলিয়া। তার তৈরি প্রসাধনসামগ্রীর ভেতরেই লুকিয়ে থাকত এই বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন বিষ।
অ্যাকোয়া টোফানার মূল রহস্য লুকিয়ে ছিল এর ধীরগতির কার্যকারিতায়। একবারে কাউকে মারত না এটি।
প্রথম ফোঁটা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে শিকারের শরীরে দেখা দিত সামান্য ক্লান্তি আর মৃদু জ্বর। দ্বিতীয় ফোঁটায় শুরু হতো পেটের তীব্র যন্ত্রণা। আর তিন বা চার নম্বর ফোঁটার পর আক্রান্ত ব্যক্তি ঢলে পড়ত মৃত্যুর কোলে। ফলে কোনো সন্দেহ ছাড়াই স্বামীদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে স্ত্রীরা আইনগতভাবে সম্পত্তি ও স্বাধীনতার মালিক হয়ে উঠত।
জুলিয়া একা ছিলেন না। এই বিষ তৈরির কৌশলকে তিনি এক বিরাট গুপ্ত সাম্রাজ্যে রূপ দিয়েছিলেন। মেয়ে জিরোলামা স্পেরা এবং কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগীকে নিয়ে তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে রোম ও নেপলসের বুকে এ ব্যবসা চালিয়ে যান।
অ্যাকোয়া টোফানার মূল রহস্য লুকিয়ে ছিল এর ধীরগতির কার্যকারিতায়। একবারে কাউকে মারত না এটি
কিন্তু ভাগ্য কোনোদিন একরেখায় চলে না। এক তরুণী গৃহবধূর ভালোবাসার ভুলই ধসিয়ে দিল জুলিয়ার এত বছরের সাজানো সাম্রাজ্য। এক রাতে, নিজের অত্যাচারী স্বামীর স্যুপের বাটিতে অ্যাকোয়া টোফানার প্রথম ফোঁটা মিশিয়ে দিয়েছিল সেই তরুণী। কিন্তু স্বামী যখন বাটিটি মুখে তুলতে গেল, ঠিক তখনই মেয়েটির মন অপরাধবোধ আর ভয়ে কেঁপে উঠল। সে চিৎকার করে বাটিটি ফেলে দিল এবং স্বামীর পায়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো সত্য স্বীকার করে ফেলল।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো শহরে যেন দাবানল জ্বলে উঠল। স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো পোপের বিচারকদের কাছে। নির্মম নির্যাতনের মুখে মেয়েটি বলে দিল জুলিয়া টোফানার নাম। খবর পেয়েই জুলিয়া পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন এক স্থানীয় চার্চে। কিন্তু ততক্ষণে রোমের বাতাসে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে— জুলিয়ার বিষ নাকি শহরের পানীয় জলের আধারে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে! ক্রুদ্ধ জনতা চার্চের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে জুলিয়াকে টেনেহিঁচড়ে পোপের বিচারালয়ে নিয়ে এলো।
বিচারের মুখোমুখি হয়ে জুলিয়ার ওপর চালানো হলো অমানুষিক অত্যাচার। অবশেষে ভাঙা গলায় জুলিয়া স্বীকার করলেন তার বিষাক্ত সুধার দীর্ঘ ইতিহাস। এই কাচের বোতলের ছোঁয়ায় প্রাণ গেছে ছয়শরও বেশি পুরুষের।
১৬৫৯ সালের জুলাই মাস। ইতিহাস বলে, ওই সময় রোমের বিখ্যাত পিয়াতজা দে ফিয়োরি চত্বরে হাজার মানুষের জনতার সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় জুলিয়া টোফানা, তার মেয়ে জিরোলামা এবং মূল সহযোগীদের। তবে অনেক ইতিহাসবিদ বলে থাকেন, ১৬৫১ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গিয়েছিলেন তিনি।
ইতিহাস তাকে একাধারে ভয়ংকর এক বিষপ্রয়োগকারী এবং নির্যাতিত নারীদের এক অন্ধকার রক্ষাকর্তা হিসেবেই মনে রেখেছে।






