বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হত্যারহস্য

আঁকা: সোহানুর রহমান
২০ বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি আফতাব আহমেদ হত্যাকাণ্ডের। মামলার বাদী, কিলিং মিশনের পরিকল্পনাকারী, সন্দেহভাজন দুই ঘাতক এরই মধ্যে পরপারে। লিখেছেন মাহবুব আলম লাবলু
অনেক আগেই সন্ধ্যা পেরিয়ে অন্ধকার নেমেছে। আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। সেই অন্ধকারের পর্দা চিরে দিচ্ছে বিদ্যুতের ঝলকানি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কোথাও বজ্রপাতের কান ফাটানো নিনাদ। এমন সময় আমার মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই চমকে উঠলাম। নম্বরটা আমার মোবাইলে সেভ করা ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড সোর্স’ নামে। বুঝতে বাকি রইল না নগরীর কোথাও অঘটন ঘটেছে। মোবাইল বাটনে চাপ দিয়ে কল রিসিভ করতেই অন্যপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো, ‘ক্যাম্পাসে খবর নেন। বড় অপারেশন হয়েছে। এটুকু বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।’
ইমন কিলিং মিশন সম্পর্কে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে নিজেকে রেখেছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে
আমিও দেরি করলাম না। অফিসের পিএবিএক্সে কল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আফতাব আহমেদকে ধরতে বললাম। কারণ তিনি খুন হতে পারেন— এমন তথ্য কয়েক দিন আগে একই সোর্সে পেয়েছিলাম। কিলিং মিশনের পরিকল্পনা নিয়ে আগাম রিপোর্টও করেছিলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ডেস্কের টেলিফোন বেজে উঠল। একমুহূর্ত দেরি না করেই রিসিভার তুললাম। অপারেটর বললেন— ভাই, স্যারের বাসায় দিয়েছি, কথা বলেন।
হ্যালো, এটা কি আফতাব স্যারের বাসা?
ওপারে কাঁপা নারী কণ্ঠে জবাব, জে।
স্যারকে একটু দেওয়া যাবে?
এবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে জবাব এলো, ‘স্যারকে বাসায় ঢুইক্যা ক্যারা যেন গুলি করচে। ম্যাডাম স্যারকে নিয়া হাসপাতালে গ্যাচে।’
টেলিফোনের রিসিভারটা রেখেই দ্রুত গিয়ে ঢুকলাম অমিতদার রুমে (সবশেষ দেশ রূপান্তরের প্রয়াত সম্পাদক অমিত হাবিব)। ঢুকে দেখি অমিতদা আর ছোটন ভাই ওই দিনের লিড স্টোরি কী হবে, তা নিয়ে আলাপ করছেন। এ আলাপের মাঝে ঢুকে বললাম, ‘লিড স্টোরি মনে হয় আমার হাতে। ঘটনা ঘটে গেছে। আফতাব স্যার সম্ভবত মার্ডার হইছেন। আমার জন্য জায়গা রাইখেন। আমি স্পটে যাচ্ছি।’ তারপর অফিস থেকে নিচে নামলাম।
খুনের মোটিভ উদ্ধার ও যারা সুপারি দিয়েছিলেন, তাদের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন তদন্তকারীরা
ততক্ষণে আকাশে জমাট বাঁধা মেঘ বৃষ্টি হয়ে অঝোরে ঝরছে। দিনটি ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। রাত ৮টা পার। আমি তখন যায়যায়দিন পত্রিকায় ক্রাইম সেলে কাজ করি। কয়েক মাস আগেই বড় বাজেটে নতুন কলেবরে পত্রিকাটি বাজারে এসেছে।
বৃষ্টি উপেক্ষা করে গায়ে রেইনকোট চাপিয়ে বাইক নিয়ে বের হলাম। সাতরাস্তা পার হতেই টের পেলাম আমার মোবাইলের রিংটোন বাজছে। বাইক থামিয়ে কল রিসিভ করলাম। ঢাকা মেডিকেল প্রতিনিধির কল। জানালেন, আফতাব স্যারকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
শমরিতা হাসপাতালে পৌঁছে যতদূর সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করে দ্রুত অফিসে ফিরলাম। অমিতদাকে গিয়ে বললাম স্যারের অবস্থা ভালো নয়।
দাদা সব শুনে শুধু বললেন, যা পাইছেন লেখেন। আমি লেখা শুরু করেছি মাত্র। আবার অমিতদার রুমে ডাক পড়ল। এবার গিয়ে দেখি, দাদা একা নন, সঙ্গে আছেন ছোটন ভাই। রুমে ঢুকতেই তার জিজ্ঞাসা, ‘আপনি আগাম তথ্য কীভাবে পাচ্ছেন? কয়েক দিন আগে আপনি লিখলেন, সিরিয়াল কিলিংয়ের পরিকল্পনা হচ্ছে। তাতে আফতাব স্যারের নামও ছিল।’ বললাম, ‘সোর্সের মাধ্যমে জেনেছি।’ আমি লেখার টেবিলে ফিরে দ্রুত রিপোর্ট শেষ করে জমা দিলাম।
‘স্যারকে বাসায় ঢুইক্যা ক্যারা যেন গুলি করচে। ম্যাডাম স্যারকে নিয়া হাসপাতালে গ্যাচে।’
গুলি খাওয়ার তিন দিন পর আফতাব আহমেদ মারা যান। জানা যায়, ২০১৫ সালে আফতাব আহমেদের স্ত্রী নুরজাহানও মারা যান। আফতাব-নুরজাহান দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন। তাদের পালিত ও প্রতিবন্ধী মেয়েটিও পরে মারা যান।
হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ছিল খুবই স্পর্শকাতর। কিলিং মিশনে জড়িতদের সূত্রে ওই সময়ে অপরাধ জগতের সক্রিয় এমন এক ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছিলেন, ড. আফতাব আহমেদের দেওয়া একটি রাজনৈতিক বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছিল প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী। এরপরই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মোটা টাকার বিনিময়ে এই খুনের ‘সুপারি’ (খুনের চুক্তি) পেয়েছিলেন তখন ভারতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার তানভীর ইসলাম জয় ও তার ঘনিষ্ঠ আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। এদের নিখুঁত পরিকল্পনায় চালানো হয়েছিল কিলিং মিশন।
গুলি খাওয়ার তিন দিন পর আফতাব আহমেদ মারা যান
ভারত থেকে ফেরত আনা সানজিদুল ইসলাম ইমন ২০০৮ সালে আফতাব হত্যার ঘটনায় জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। কিন্তু অপরাধ জগতের ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে কুখ্যাত ইমন কিলার ও কিলিং মিশন সম্পর্কে দেওয়া চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিতে নিজেকে রেখেছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ইমনের দাবি, তিনি ভারতে অবস্থানের সময় তানভীর ইসলাম জয়ের সহযোগীরা তাকে বলেছিল, জয় ও তার লোক আবলান, রফিক, এতিম বেলাল, খোকন ও মাহবুব এই হত্যায় জড়িত। আবলান, রফিক ও এতিম বেলাল বাসায় গিয়ে আফতাবকে গুলি করেন। তাদের মধ্যে খোকন ২০০৬ সালে রমনায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন এবং আবলান ২০০৮ সালের নভেম্বরে মোহাম্মদপুরে খুন হন। রফিক, এতিম বেলাল ও মাহবুবের ঠিকানা পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ২০০৮ সালের আগেই শোয়েব সাইফ এবং সন্দেহভাজন হুমায়ুন কবীর ওরফে মুন্না ও সালেহ আহম্মেদ ওরফে সুজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ইমনের জবানবন্দি ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যে ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট সিআইডি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মফিদুল হাসান তৃপ্তিকে গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। একে একে আফতাব হত্যায় গ্রেপ্তার সবাই কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে যায়।
মামলার তদন্তকালে একসময়ের তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ সুপার মো. এনামুল কবিরের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তথ্যে উঠে আসা আফতাব খুনে জড়িত সন্ত্রাসী তানভীর ইসলাম ওই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছিলেন। তাকে ধরতে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। পরে মালয়েশিয়ায় জয়ের মৃত্যু হয়। আর গ্রেপ্তার ব্যক্তিদেরও ওই হত্যায় সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
সবশেষ তথ্য খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, সিআইডির ডিপফ্রিজেই আটকে আছে এই মামলার তদন্ত। ২০ বছরেও মামলাটির চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট আদালতে জমা দেয়নি তদন্তকারী সংস্থা।
লেখার শুরুতে বলেছি, খুনের রাতে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড সোর্স’ নামে সেভ করা নম্বর থেকে আসা কলে কিলিং মিশন চালানোর যে তথ্য পেয়েছিলাম, সেই সোর্স অন্য কেউ নয়; তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীর ইসলাম জয়।




