তুলির টানে বিশ্বকে বোকা বানানো জাদুকর

ভল্ফগ্যাং বেলট্রাক্কি
জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সংগ্রাহকদের থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এক শিল্পীর গল্প বলেছেন ইমরানুর রহমান
এই গল্পের নায়ক, কিংবা বলা ভালো খলনায়ক ভল্ফগ্যাং বেলট্রাক্কি। কোনো খুনোখুনি বা অস্ত্রের ব্যবহার ছাড়া, স্রেফ হাতের তুলি আর রঙের জাদুতে তিনি ৪০ বছর ধরে বোকা বানিয়ে রেখেছিলেন পৃথিবীর বাঘা বাঘা শিল্প গবেষক, নিলামকারী আর ধনকুবেরদের।
বেলট্রাক্কি একজন জার্মান চিত্রশিল্পী। তিনি যেকোনো বিখ্যাত চিত্রকরের আঁকার শৈলী বা ‘স্টাইল’ হুবহু নকল করতে পারতেন। তবে প্রচলিত কোনো বিখ্যাত ছবি কপি করতেন না। তার ভাবনা ছিল, ম্যাক্স আর্নস্ট বা হাইনরিখ ক্যাম্পেনডংকের মতো শিল্পীরা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে কেমন ছবি আঁকতেন? তিনি সে মৃত শিল্পীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে সম্পূর্ণ নতুন ছবি আঁকতেন এবং সেগুলোকে ওই শিল্পীদের ‘হারিয়ে যাওয়া আসল ছবি’ বলে বাজারে ছাড়তেন।
বেলট্রাক্কি ও তার স্ত্রী হেলেন এক অবিশ্বাস্য গল্প ফাঁদেন। হেলেন দাবি করেন, তার দাদু নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য জার্মানির এক গোপন স্থানে এই অমূল্য ছবিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হেলেনকে তার দাদির মতো সাজিয়ে, পেছনে সেই জাল ছবিগুলো ঝুলিয়ে পুরনো ক্যামেরায় সাদা-কালো ছবিও তোলেন। এই নিখুঁত চালের কারণে শত শত কোটি টাকার জাল ছবি আসল হিসেবে বিক্রি হতে থাকে বিশ্বখ্যাত সব আর্ট গ্যালারিতে।
ছবিগুলোকে প্রাচীন দেখানোর জন্য বেলট্রাক্কি বিভিন্ন পুরনো চার্চ বা বাজার থেকে শত বছরের পুরনো ক্যানভাস ও ফ্রেম কিনতেন। এমনকি ক্যানভাসের পেছনে লেগে থাকা ধুলোবালিও তিনি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখতেন, যাতে কোনো খুঁত না থাকে। এভাবে ৪০ বছর ধরে তিনি ও তার স্ত্রী রাজকীয় জীবনযাপন করেন এবং প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ডলারের বেশি আয় করেন।
কিন্তু ২০১০ সালে একটি ছোট্ট ভুলের কারণে বেলট্রাক্কির এই বিশাল সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ২০০৬ সালে তিনি ডাচ চিত্রশিল্পী হাইনরিখ ক্যাম্পেনডংকের শৈলীতে ‘রেড পিকচার উইথ হর্সেস’ নামে একটি ছবি আঁকেন, যা প্রায় ২৮ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। পরে পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই ছবিতে ‘টাইটানিয়াম হোয়াইট’ নামক একটি সাদা রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ ১৯১৪ সালে, যখন আসল ছবিটি আঁকা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছিল, তখন এই রঙ আবিষ্কারই হয়নি!
২০১১ সালে আদালত তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বেলট্রাক্কি এখন নিজের নামেই ছবি আঁকেন এবং তার সেই ছবিগুলোও এখন চড়া দামে বিক্রি হয়।




