Agamir Somoy E-Paper
রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬
আগামীর সময়
মানুষের তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন রাসেল
রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

info@agamirsomoy.com

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় ফিচার

সেবা প্রকাশনীর জন্য ভালোবাসা

ইশতিয়াক হাসান
ইশতিয়াক হাসান
agamir somoy
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১৩:০২
সেবা প্রকাশনীর জন্য ভালোবাসা

সেবা প্রকাশনীর বিখ্যাত কয়েকটি বই

শীতের মিষ্টি সকালে জানালা গলে এক ফালি রোদ এসে পড়ছে আমার চোখে-মুখে, হাতের খোলা বইটায়। আরামদায়ক এই পরিবেশে নানার বাড়ির বারান্দালাগোয়া ৭ ফুট বাই ৬ ফুট ছোট্ট রুমে শুয়ে থাকা আমি গণ্ডি পেরিয়ে হারিয়ে গিয়েছি অন্য এক জগতে। দীর্ঘ-আকাশছোঁয়া পাহাড়সারি, ধু-ধু মরুভূমি, সীমান্ত শহরের ধূলি-ধূসরিত রাস্তা, সেলুনে গ্লাসের টুংটাং, হঠাৎ মাথায় হ্যাট চাপানো রুক্ষ চেহারার কাউবয়ের খিস্তি-খেউর, আচমকা দুই পিস্তলবাজের গোলাগুলি কিংবা ঘোড়ায় টানা ওয়াগনের শহরে প্রবেশ যেখানকার পরিচিত চিত্র।

সত্যি, সময়টা ছিল ওয়েস্টার্নে বুঁদ হয়ে থাকার। সেবাই আশ্চর্য এই স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ করে দিয়েছে আমাকে, আমাদের। ঠিক কোন ওয়েস্টার্নের মাধ্যমে বুনো পশ্চিমের ওই জগতে পদার্পণ, তা আর মনে নেই। তবে সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন। নানার বাড়ির বইয়ের আলমারির গল্প আগের এক লেখায় বলেছি, ওখানকার কোনো একটি বই দিয়ে শুরুটা সন্দেহ নেই। কারণ, আমাদের বাসায় আব্বুর সংগ্রহশালায় কোনো ওয়েস্টার্ন ছিল না।

তবে ওয়েস্টার্নের প্রতি সত্যিকারের টানটা মনে হয় ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়। তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকি। গলির মধ্যে সোলায়মানীয়া লাইব্রেরিতে ঢু মারতাম ওয়েস্টার্নের খোঁজে। ওই লাইব্রেরি নিয়ে বিস্তারিত বলব তিন গোয়েন্দা নিয়ে কোনো লেখায়। ওখান থেকে কেনা বইয়ের মধ্যে এপিঠ-ওপিঠ আর রাইডারের নাম এখনো মনে আছে।

সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্ন পাঠকদের নিয়ে যায় বুনো পশ্চিমেএদিকে, আমাদের বাসার কাছেই ছিল নোমান ভাইদের বাসা। ওয়েস্টার্ন, হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডসহ নানান সেবার বইয়ে ভরপুর ছিল তাদের বিশাল দুটো ট্রাংক। তবে কথা হলো, নোমান ভাই বই দিতে বেজায় ঘোরাতেন। আমি তাই কখনো কখনো তিনি বাড়িতে না থাকা অবস্থায় যেতাম। গেট ঠেলে, হালকা উঠোন পেরিয়ে তার বাকি তিন ভাইবোন জিলানী ভাই কিংবা কল্যাণী বা ভিক্টোরিয়া আপার যেকোনো একজনকে পেলেই কেল্লাফতে। আধো অন্ধকার ওই কামরাটায় নিয়ে যেতেন, যেখানে চাবি দিয়ে তালা খুললেই ঘর ভরে যেত বইয়ের অদ্ভুত সুবাসে, নাক ভরে ওটা টেনে নিয়ে পছন্দের বইয়ের খোঁজে পারলে ট্রাংকের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতাম।

এই নোমান ভাই ও ওয়েস্টার্ন নিয়ে আছে আরেক দুঃখস্মৃতি। তখন ঢাকা আসা হতো প্রায়ই। ফেরার পথে রেলওয়ে বুক স্টল ক্যামলেট বা সৃজনী থেকে দুই-চারটা বই কেনা চাই। সৌভাগ্যক্রমে একবার পেয়ে গেলাম বাথান-১। হুয়ান কার্টেয স্যাবাডিয়ার বাথান সেবার সেরা ওয়েস্টার্নগুলোর একটি। কাজেই ওই এক খণ্ডই কিনে নিলাম। তো, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিরতে ভিক্টোরিয়া বা কল্যাণী আপা মারফত বাথান-২ পেয়েও পড়লাম। তারপর নোমান ভাই একদিন উল্টো আমার কাছে বাথান-১ চাইলেন। বললেন, তারটা হাতের নাগালে নেই, পড়ার তৃষ্ণা পেয়েছে বড়। দিলাম, ওই বই আর কোনোকালে ফেরত পাইনি। পরে জানতে পারি, নোমান ভাইয়ের সংগ্রহশালায় বাথান-১ ছিল না!

আরেকটা স্মৃতি বেশ মনে পড়ছে। তখন রোজার মাস। ক্লাস সেভেনে পড়ি সম্ভবত। ক্লান্তির কথা বলে পড়ালেখায় বেশ ছাড় পাওয়া যেত। নিজের সংগ্রহের ওয়েস্টার্নগুলো পড়া শেষ, নোমান ভাইদের ভাণ্ডার থেকে কোনো কারণে বই আনা যাচ্ছিল না। দাতিয়ারায় আমাদের বাসা থেকে মিনিট পনেরো হাঁটলেই আলাল ভাইদের বাসা। দুপুরের কড়া রোদে রোজা রেখে হেঁটে চলে যেতাম সেখানে। আলাল ভাইয়ের কাছে কিছু ওয়েস্টার্ন ছিল। একটা বই নিয়ে বাসায় এসে খিদা খিদা পেটে হারিয়ে যেতাম বহু আগের সেই বুনো আমেরিকায়! কী যে অদ্ভুত আনন্দময় ছিল ওই সময়ে ওয়েস্টার্ন পড়া। ওই দফায় পড়া বইগুলোর মধ্যে একটি ছিল মুক্তপুরুষ, যদ্দূর মনে পড়ছে।
সেবার পাঠকের সংগ্রহে ভাগ্যচক্র ১,২ওয়েস্টার্নের এত ভক্ত কেন হয়ে গেলাম? অনেকবারই নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি। উত্তর যেটা পেয়েছি, ওই বালক-কিশোর বয়সে ভিন্ন এক পরিবেশ-জায়গার মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার, কাহিনির নায়কদের অদ্ভুত সাহসিকতা, আউটলদের পিস্তলবাজি, কাউবয়দের ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে আশ্চর্য জীবন, বিশাল সব র‌্যাঞ্চ, বুনো প্রকৃতি, মার্শাল-শেরিফ, পদে পদে উত্তেজনা, সেই সঙ্গে রোমান্টিকতা— সব মিলিয়ে কুপোকাত হয়েছি। অবশ্য এই আধবুড়ো বয়সে এখনো ওয়েস্টার্ন আমাকে টানে আগেরই মতো।

সবচেয়ে বেশি ওয়েস্টার্ন সংগ্রহ করেছি, এসএসসি পাসের পর ঢাকা সিটি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। নতুন নীলক্ষেত চেনা এই আমি সংঘাত, রূপান্তর, ভাগ্যচক্র, রত্নগিরি, পাতকীসহ কত বই কিনেছি সেখান থেকে! অবশ্য নতুন বইও যোগ হয়েছে তখন বিভিন্ন দোকান থেকে আমার সংগ্রহে। এই সুযোগে বাথানের দুটো খণ্ডই বইয়ের আলমারিতে নিয়ে আসতে পারলাম। নানার সংগ্রহের বুনো পশ্চিম ও ওয়েস্টার্ন ভলিউম-১ নিজের করে নিয়েছি। নানা ঢাকা এসে হেঁটে হেঁটে সেবায় গিয়ে যেসব বই কিনেছেন, তার একটি এই ভলিউমটা।

ওয়েস্টার্নে কোন চরিত্র প্রিয়, এটা বলতে গেলে বেশ ধন্দে পড়তে হয়! কোনটা ফেলে কোনটা বলব— বুনো পশ্চিমের টম প্রেস্টন, ফেরার হ্যারি কার্টার, আলেয়ার পিছের এরফান জসাপ (এরফানকে নিয়ে বেশ কয়েকটা বই লেখা হয় পরে, তবে আমার মনে জায়গা করে নেয় ওই আলেয়ার পিছেই), বাথান-ছায়াশত্রুর সাবাডিয়া, ভাগ্যচক্রের ড্যান, রূপান্তরের গর্ডন ফেবলস, ওরিন-অ্যানজেল-নোয়েল ওসমান, রক বেননসহ আরও কত প্রিয় নায়ক আমার অন্তরে এখনো জীবিত!

বুনো পশ্চিমের টম প্রেস্টনের সেই সহকারী মাস্টাং উইলিয়ামস কিংবা এপিঠ-ওপিঠের খারাপ মানুষের মুখোশ পরে থাকা ভালো মানুষ ফোবিয়ানের কথা কীভাবে ভুলি! প্রিয় নায়িকা চরিত্রের অভাব নেই। রাকা ওয়েস্ট, বেলিন্দা, নোরা, ড্রুসিলা... তবে এসব প্রিয় চরিত্রের কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছি সেবা প্রকাশনী এবং কাজী মাহবুব হোসেন, রওশন জামিল ও শওকত হোসেনদের কল্যাণে।

সেবার পাঠকের সংগ্রহ থেকে
দুই
আবার ফিরে যাই নানার বাড়িতে। ছোটবেলায় আমার প্রিয় স্মৃতিগুলোর একটি ছিল নানার বাড়িতে গিয়ে, উত্তর ঘরে কিংবা পশ্চিম ঘরের কোনার রুমে শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়া। তখন গ্রামগুলোতে পুরোপুরি শহুরে ভাব আসেনি। উত্তর ঘর ছিল পুরোই টিনের আর পশ্চিম ঘরের চালা টিনের। দিনে জানালার গোটানো পর্দার পাশ দিয়ে কিংবা টিনের ভাঙা ফুটো গলে যে সূর্যরশ্মি আসত, তাতে বই পড়া জমত বেশ। নানার আলমারি ভরা ছিল গাদা গাদা বই। ভারতীয় লেখকদের কিছু বই থাকলেও সেবার উপন্যাসই ছিল বেশি। আমাদের খালাতো-মামাতো ভাইবোনদের মনোযোগও ছিল ওদিকে।

কুয়াশা সিরিজের প্রায় সব বইই ছিল ওখানে। ওয়েস্টার্ন আর মাসুদ রানার বইও ছিল বিস্তর। তো, শুরুতে মাসুদ রানা পড়ার অনুমতি না মেলায় কুয়াশা আর ওয়েস্টার্নেই ছিল যত মনোযোগ। ওয়েস্টার্ন পড়তে গিয়ে বুনো পশ্চিমে, কুয়াশা পড়তে গিয়ে অজানা নরমাংসভোজীদের দ্বীপ, আফ্রিকার জঙ্গল কিংবা ভিনগ্রহে হারিয়ে যেতাম অবলীলায়। পরিচয় হতো কত ধরনের চরিত্রের সঙ্গে। কখনো নিজেই বনে যেতাম ওয়েস্টার্ন বইয়ের নায়ক টম প্রেস্টন কিংবা এরফান জেসাপ, কখনো কুয়াশা কিংবা দুঁদে গোয়েন্দা শহীদ খান।

একবার নানার বাড়ি গিয়ে আবিষ্কার করলাম, ওখানকার ওয়েস্টার্ন আর কুয়াশার ভাণ্ডার পড়া শেষ আমার। ওই সময় ছোট মামা প্রথম বেছে বেছে রানার আমার উপযোগী বইগুলো দেওয়া শুরু করলেন। লেনিনগ্রাদ ও অ্যামবুশের মতো ভালো মানুষ (!) বইয়ে মজলাম তখনই। ও ধরনের, যে অল্প কয়েকটি বই আছে, ওগুলো শেষ হলে মামা মাসুদ রানার অন্য বইগুলোর (মানে যেগুলোতে বড়দের ম্যাটার একটু কম আছে!) পাতা ভাঁজ করে দিতেন। ওই ভাঁজ করা পাতাগুলো আমার পড়া বারণ। আমার কাজিনরা এখনো বিশ্বাস করতে চায় না, ওই পাতাগুলো তখন সত্যি পড়িনি আমি!

আমাদের রহস্য-রোমাঞ্চের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া এই বইগুলোর কিছু অবশ্য মামারা যোগ করেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সূত্রে ঢাকা-চট্টগ্রামে আস্তানা গাড়ার পরে। নানা কখনো কখনো ঢাকা এলে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতেন সেবা প্রকাশনী। একগাদা বই কিনে ফিরতেন।

সেবার জনপ্রিয় সিরিজ কুয়াশা। ছবি: লেখক
এই বই ও নানাকে ঘিরে আছে এক আশ্চর্য কাহিনি। তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। নানার বাড়ি হবিগঞ্জের মাধবপুরের দেবনগরের দিকেও আসতে শুরু করেছে পাকিরা। এদিকে নানাদের গ্রাম থেকে খুব দূরে নয় ভারতের সীমানা। পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে একপর্যায়ে স্থির হলো— নানা বাড়ির মেয়েরাসহ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য সীমানার ওপারে নানার বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেবে।

রওনা দেওয়ার সময় সবাই অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, বাড়ির মূল্যবান সব জিনিসপত্র রেখে গেলেও নানা তার সব গল্পের বই এক ট্রাংকে পুরে ওটা নিয়ে চলেছেন। অবশ্য কেউ বাধাও দিল না। কারণ তার ছেলেমেয়েদের ভালো করেই জানা ছিল, প্রিয় বইগুলো যখন সঙ্গে নিয়েছেন, এগুলো ফেলে যাবেন না কিছুতেই।

ওই ট্রাংকে ছিল কুয়াশা, মাসুদ রানা, রহস্য পত্রিকাসহ সেবার অনেক উপন্যাস, মানে স্বাধীনতা-পূর্ব সেবার যেসব বই বের হয়েছে, এর একটা বড় অংশ। আর ছিল নামি ভারতীয় লেখকদের উপন্যাস। মজার ঘটনা, যুদ্ধ শেষে ওই ট্রাংক আবার টানতে টানতে নিয়ে এসেছিলেন নানা নিজে।

এবার কুয়াশা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। পুলিশের চোখে বড় অপরাধী হলেও স্বাভাবিকভাবেই দরিদ্রদের সাহায্য করা প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কুয়াশা আমার বালক মন জয় করে নিয়েছিল। তার সঙ্গে কখনো জমাট রহস্য ভেদ করতে, আবার কখনো দুর্গম সব জায়গায় অ্যাডভেঞ্চারে বের হতে দারুণ লাগত। কুয়াশার পাশাপাশি শহীদ, কামাল, মহুয়া, লীনা, ডি কস্টা, মান্নান, কলিম, সিম্পসন এমনকি কুয়াশার বড় শত্রু নূর বক্সও বড় আপন হয়ে গেল।

কুয়াশার রহস্য-রোমাঞ্চময় জগতে যখন প্রবেশ করি, তখন সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়ি। নানার বাড়ির উত্তর ঘরে কিংবা পশ্চিম ঘরের ছোট কোনার রুমে শুয়ে শুয়ে বই পড়তাম। পর্দার ফাঁক গলে সূর্যের আলো পড়ত বইয়ের পাতায়। আমিও হারিয়ে যেতাম কল্পনার এক জগতে। এখনো যেন সেইসব দৃশ্য চোখের সামনে চলে আসছে।

স্বাভাবিকভাবেই তখন আর কুয়াশার আলাদা বইগুলো নিজের পক্ষে সংগ্রহ করার সুযোগ ছিল না। তাই ভলিউমগুলোই কিনেছিলাম। অবশ্য এখন মাঝেমধ্যে মনে হয়, নানার বইগুলো সঙ্গে নিয়ে এলেই ভালো হতো।

কারণ সেই দুর্লভ কুয়াশাগুলো মানুষেরা নিয়ে আর ফেরত দেননি। মূলত নানা মারা যাওয়ার পর এ ঘটনা ঘটে। বইয়ের মালিক না থাকলে যা হয় আর কি!

কুয়াশা এখনো আমার প্রিয়। কখনো সময়-সুযোগ পেলে পুরনো বইগুলো হাতে নিয়ে বসে পড়ি। কুয়াশার প্রায় সব বইয়ের অরিজিনাল প্রিন্ট সংগ্রহও করেছি। কুয়াশা সিরিজ বন্ধ হয়ে গেলেও মাঝখানে মাসুদ রানায় কুয়াশার উপস্থিতিও দারুণ আনন্দ দিয়েছিল।

সেবার পাঠকের সংগ্রহে অথৈ সাগর ১, ২
তিন
ক্লাস থ্রিতে পড়ি সম্ভবত তখন। বই পড়ার দৌড় বলতে রূপকথার রাক্ষস-দৈত্য-দানব, রাজকুমার-রাজকন্যা আর কিছু ইসলামি বই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। থাকতাম এক মফস্বল শহরে। কিন্তু পরিবারের চিকিৎসা আর আত্মীয়স্বজনের টানে ঢাকায় আসা হতো নিয়মিত। সেই এক সফরেই ছোট্ট এই আমার জন্য খুলে গিয়েছিল অন্য এক দরজা।

সেদিন বের হয়েছিলাম আমার ছোটবেলার হিরো, খালাতো ভাই নাহিদ ভাইয়ার সঙ্গে। আমার চেয়ে চার ক্লাস ওপরে পড়ে, বয়সে বড়, বুদ্ধিতে আরও বড়। পরে তার নামেই শুরু করি আমার ‘নাহিদ— দ্য ইনভেস্টিগেটর’ সিরিজ। তখন ওদের বাসা বেইলি রোডে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে এলাম শান্তিনগর মোড়ে।

সেই সময়ের শান্তিনগর ছিল বইয়ের ছোট্ট এক রাজ্য। আশপাশে অন্তত তিনটি ‘সবুজ লাইব্রেরি’। প্রতিটি দোকান যেন কাগজে বাঁধানো গুপ্তধনের ঘর। তাকভর্তি গল্পের বই, আর সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ত সেবা প্রকাশনীর রঙিন মলাট। কিন্তু তখনো জানি না, ওই বইয়ের ভেতরেই আমার ভবিষ্যতের অসংখ্য রাত জেগে থাকা অপেক্ষা করছে।
দোকান দেখে বললাম, একটা বই কিনব।
নাহিদ ভাইয়া জিজ্ঞেস করল, কী বই?
বললাম, রূপকথার বই।
সে একটু হেসে বলল, আজ তোমাকে অন্য একটা বই কিনে দিই।
তারপর আমার হাতে তুলে দিল পাতলা কিন্তু অদ্ভুত টানমাখা এক বই, হারানো উপত্যকা। প্রচ্ছদে আরও দুটি শব্দ লেখা। তিন গোয়েন্দা।

তিন গোয়েন্দার জনপ্রিয় কয়েকটি বই। ছবি: সংগৃহীততিন গোয়েন্দার জনপ্রিয় কয়েকটি বই। ছবি: সংগৃহীত
এখনো মনে আছে, আমার কাছে ছিল ১১ টাকা। দাম ১৩। বাকি দুই টাকা নাহিদ ভাইয়াই দিল। সেই ১১ টাকাই হয়তো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাহিত্য বিনিয়োগ।
সেদিনই শুরু হয় তিন গোয়েন্দার রহস্য-রোমাঞ্চ জগতে আমার প্রবেশ। যেন সাধারণ এক বালক হঠাৎ গোপন দরজা খুলে ঢুকে পড়ল অভিযানের অন্ধকার সুড়ঙ্গে।

প্রথমবার বইটি পুরো বুঝিনি। অভ্যস্ত ছিলাম না সে ধরনের গল্পে। কিন্তু কিছুদিন পর আবার পড়লাম। তারপর আবার। তারপর আরও কতবার! আমার কেনা বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পড়া বই সম্ভবত এটাই। তিন গোয়েন্দার কথা ভাবলে আজও সবার আগে চোখে ভেসে ওঠে হারানো উপত্যকার সেই প্রচ্ছদ।

কিশোর-রবিন-মুসা ছাড়াও ভিকি, খালা, জুলিয়ান চরিত্রগুলো আজও যেন কোথাও জীবন্ত। মনে হয়, চোখ বন্ধ করলেই আবার তাদের সঙ্গে দৌড় শুরু হবে।

পুরনো সেই কপিটা এখনো আমার কাছে আছে। পরে ছয় বইয়ের ভলিউমেও পেয়েছি। সম্প্রতি আবার অরিজিনাল এক মিন্ট কপি কিনেছি। তবু প্রথম বইটির পাতায় যে গন্ধ, যে কাঁপা কাঁপা স্মৃতি, তা আর কোথাও নেই।
তিন গোয়েন্দা সিরিজের প্রথম বইয়ের নামও তিন গোয়েন্দা। ছবি: সংগৃহীততিন গোয়েন্দার সঙ্গে পরিচয়টা পাকাপোক্ত হয় পরেরবার ঢাকা গেলে, সেই নাহিদ ভাইয়ার কল্যাণেই। মনে আছে, এবার কিনেছিলাম ছয়টা বইয়ের ভলিউম-৩। বইয়ের দাম রেখেছিল ডিসকাউন্টের পর ৬৯ টাকা। নাহিদ ভাইয়াকে এবার জুড়তে হয়েছিল আট টাকা।

তারপর আর তিন গোয়েন্দার ভক্ত হতে সময় লাগেনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমার মতো আরও কিছু বইপোকা পেয়ে গেলাম। হাতে হাতে ঘুরত তিন গোয়েন্দার বই। পড়তে পড়তেই আমরা কয়েকজন বন্ধু সিদ্ধান্ত নিলাম—আমরাও হব গোয়েন্দা। খুলে ফেললাম নিজেদের রহস্যভেদী দল।

কী অদ্ভুত মজার সময় ছিল সেটা! অচেনা কাউকে দেখলেই মনে হতো সন্দেহজনক চরিত্র, কোনো গাড়ি দেখলেই ভেবে বসতাম সোনাভর্তি কিংবা চোরাচালানির গাড়ি। আবার রাস্তায় পড়ে থাকা কোনো অস্পষ্ট লেখার কাগজ চোখে পড়লেই মনে হতো— এ নিশ্চয়ই গুপ্তধনের মানচিত্র!

শুধু আমরা নই, তখনকার অগণিত কিশোর-কিশোরীই তিন গোয়েন্দা পড়ে গড়ে তুলেছিল নিজেদের গোয়েন্দা দল। কারও দলের নাম ‘পাঁচ গোয়েন্দা’, কারও বা ‘সাত গোয়েন্দা’। বইয়ের পাতার সেই তিন ছেলেই যেন আমাদের স্বপ্ন আর শৈশবের খেলার আসল সঙ্গী হয়ে উঠেছিল।
কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানাচার
গতকাল সেবা প্রকাশনীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি ঘোষণা দেখে যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল হৃদস্পন্দন। জানানো হয়েছিল, সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে সেবা প্রকাশনীর কার্যক্রম। খবরটি ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। পাঠকমহল থেকে মিডিয়াপাড়া, সর্বত্র শুরু হয়ে যায় আলোচনা আর উদ্বেগ। আমার কাছেও একের পর এক ফোন আসতে থাকে। সেবা-ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। ততক্ষণে চোখের কোণেও যেন অদ্ভুত এক জ্বালা অনুভব করছি।
কারণ, সেবা শুধু একটি প্রকাশনী নয়; এটি আমাদের কৈশোর, কল্পনার দরজা, অসংখ্য নির্ঘুম রাতের সঙ্গী।

তবে শেষ পর্যন্ত স্বস্তির খবরই মিলেছে। আজ সকালে কথা হলো সেবা প্রকাশনীর অন্যতম স্বত্বাধিকারী কাজী শাহনূর হোসেন ভাই এবং উপদেষ্টা মাসুমা মায়মুর আপার সঙ্গে। কথা বলে আরও নিশ্চিন্ত হলাম, আমরা সেবাকে হারাচ্ছি না।
দুজনেই নিশ্চিত করেছেন, বিষয়টি ভাইয়ে ভাইয়ে কোনো দ্বন্দ্ব নয়; বরং কয়েকজন পুরনো কর্মচারীর দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর নিরপেক্ষ অডিটের স্বার্থেই এই সাময়িক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মাসুমা মায়মুর নিশ্চিত করেছেন, পাঠকদের দুশ্চিন্তার কিছু নেই। অডিট কার্যক্রম শেষ হলেই ঈদের পর আবার শুরু হবে সেবার অনলাইন কার্যক্রম।
সুতরাং এটি বিদায়ের গল্প নয়; বরং সাময়িক বিরতিটা প্রিয় এক প্রতিষ্ঠানের নিজেকে আরও স্বচ্ছ করে পাঠকের সামনে উপস্থিত হওয়ার প্রস্তুতি।
সেবা প্রকাশনী গড়ে তোলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। ছবি: সেলিম জাহিদপাঁচ
টাইম মেশিনে নয়, বরং এক স্মৃতির সুড়ঙ্গ ধরে ফিরে যাই আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে। সেবা প্রকাশনীর তিনতলা। লোহার দরজার তালা খোলার পর ভেতরে ঢুকতেই বুকের ভেতর কেমন একটা ধুকপুকুনি শুরু হয়েছিল। বিখ্যাত লেখক শেখ আবদুল হাকিম (প্রিয় হাকিম আঙ্কেল) সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। তিনি আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন একজন কিংবদন্তির কাছে, যার নাম শুনেই তখন হাত কাঁপে, কলম থেমে যায়। মনে হচ্ছিল, রাহাত খানের কামরায় ঢুকছি।

তিনতলার সেই ভারী পর্দাটা সরিয়ে ভেতরে ঢোকার মুহূর্তটা আজও যেন সিনেমার মতো চোখে ভাসে। ভেতর থেকে এক গম্ভীর অথচ কোমল কণ্ঠ ভেসে এলো—

‘এসো।’

সামনে যে মানুষটি বসে আছেন, তিনি আর কেউ নন; ‘মাসুদ রানা’র জনক, কুয়াশার নির্মাতা, সেবা প্রকাশনীর পুরোধা, আমাদের সাহিত্যের রহস্যপুরুষ— কাজী আনোয়ার হোসেন।

সেবা প্রকাশনীর কয়েকটি বই
পথচলা শুরু হয়েছিল তার লেখা পড়ে, এবার সামনে দাঁড়িয়ে সেই লেখকের চোখে চোখ। লেখালেখির শুরু সেবার দ্বিতীয় তলায় হলেও এই দিনটাই ছিল আমার প্রথম ‘তৃতীয় তলা অভিযান’। পরে আরও অনেকবার কথা হয়েছে, সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তার সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছে। তবে প্রতিবারই মনে হয়েছে, তিনি কাজী আনোয়ার হোসেনের ছদ্মবেশে রাহাত খানই।

সেবা প্রকাশনী আমাদের ভালোবাসা। কাজী আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে যার সৃষ্টি, শেখ আবদুল হাকিম, রকিব হাসান, রাহাত খান, কাজী মাহবুব হোসেন, নিয়াজ মোর্শেদসহ অসংখ্য লেখক যাকে শক্তিশালী করেছেন। আর তার বড় শক্তি পাঠকের ভালোবাসা। সব ভুল, দুর্বলতা কাটিয়ে প্রিয় প্রকাশনী ফিরে আসুক আরও শক্তিশালী হয়ে।

সেবা প্রকাশনীকাজী আনোয়ার হোসেনতিন গোয়েন্দামাসুদ রানা
    শেয়ার করুন:
    advertisement
    advertisement
    ০৪ জুলাই ২০২৬
    রাত ১১:০০ টা
    কানাডা
    ০
    মরক্কো
    ০
    ০৫ জুলাই ২০২৬
    রাত ৩:০০ টা
    ফ্রান্স
    ০
    প্যারাগুয়ে
    ০
    ০৬ জুলাই ২০২৬
    রাত ২:০০ টা
    ব্রাজিল
    ০
    নরওয়ে
    ০
    ০৬ জুলাই ২০২৬
    সকাল ৬:০০ টা
    মেক্সিকো
    ০
    ইংল্যান্ড
    ০
    ০৭ জুলাই ২০২৬
    রাত ১:০০ টা
    পর্তুগাল
    ০
    স্পেন
    ০
    ০৭ জুলাই ২০২৬
    সকাল ৬:০০ টা
    যুক্তরাষ্ট্র
    ০
    বেলজিয়াম
    ০
    advertisement
    advertisement
    বদিউল আলম খোকনসহ তিনজনকে পরিচালক সমিতি থেকে আজীবন বহিষ্কার

    বদিউল আলম খোকনসহ তিনজনকে পরিচালক সমিতি থেকে আজীবন বহিষ্কার

    ০৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০৫

    advertiseadvertise