মুণ্ডুহীন ভয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সেবার ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলাম। প্রত্যন্ত এলাকায় গ্রাম আমাদের। আধুনিকতার ছোঁয়া একেবারেই লাগেনি। ভারত সীমান্তলাগোয়া গ্রামটির নাম নিত্যানন্দপুর। ঢাকা থেকে প্রায় আট-দশ ঘণ্টার রাস্তা। গাড়িও ছাড়ল সময়মতো। তবে সমস্যা বাধল আরিচা ঘাটে। দুই পাড়ে প্রচণ্ড জ্যাম। সারি সারি গাড়ির লাইন। গাড়িগুলো একটুও নড়ছিল না। ৩০ মিনিটে ফেরি পেরোনোর কথা। কিন্তু বিশাল লাইনের কারণে ফেরিতে উঠতেই পাঁচ ঘণ্টা।
সাতক্ষীরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় ২টা। সেখান থেকে কালীগঞ্জ যেতে আরও এক ঘণ্টা। ৩টার সময় নামিয়ে দিল রায়পুর বাসস্ট্যান্ডে। এখান থেকে আর সাত কিলোমিটার গেলে আমার বাড়ি। এমনিতেই কাঁচা রাস্তা। আবার এত রাত। তাই হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। মড়ার উপর খাঁড়ার গা হয়ে পড়ছে টুপটাপ বৃষ্টি। রাস্তায় হালকা কাদা। তবে জুতা পায়ে দিয়ে যাওয়া যাবে।
ব্যাগটা পিঠে ঝুলিয়ে হাঁটা ধরলাম। এই এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। রাস্তার দুই পাশে বড় বড় গাছ। আর একটু পরপর বাঁশবাগান। পুরো রাস্তায় তিনটা কবরস্থান পার হতে হবে। আরও আছে একটি পুকুর। মাঝেমধ্যে নাকি কালো কালো কী কী ভেসে ওঠে! লোকে বলে, পূর্ণিমা রাতে সেখানে গান-বাজনা হয়। আর অমাবস্যার রাতে শোনা যায় হুহু কান্নার আওয়াজ।
মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে হাঁটতে থাকি। আর মাঝেমধ্যে নিজের পায়ের শব্দে চমকে উঠি। কখনো মনে হচ্ছে কেউ আমার সঙ্গে হাঁটছে, আবার মনে হচ্ছে আমার পেছনে কেউ আছে। কোনো দিকে না তাকিয়ে পা চালাই। হঠাৎ থামলাম একটি বাঁশবাগানের কাছে। রাস্তার মাঝখানে বাঁশ পড়ে আছে! কী করব এখন? শুনেছি রাতে এভাবে বাঁশ পার হতে গেলেই উঁচু করে তুলে আবার ফেলে দেয়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলাম। কয়েকবার বাঁশবাগানের দিকে তাকালাম।
না, এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। চোখ বন্ধ করে বাঁশটা পার হই। তারপর একছুট। কতদূর এলাম, জানি না। হালকা বৃষ্টিতেও ঘামছি। কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে। ঘাড়ের শিরা দিয়ে এক ধরনের ঠান্ডা অনুভূতি বয়ে যাচ্ছে। বুকটা ধড়ফড় করছে।
হাঁটতে হাঁটতে কাছারি পুকুরের কাছে চলে এলাম। নামটা মনে পড়তেই কাঁপতে শুরু করেছি। মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে না। পা যেন আর চলছে না। হঠাৎ ঠপ করে কিছু পড়ল। আমি লাফিয়ে কয়েক হাত সামনে গেলাম। দম বন্ধ হয়ে আসছে। তবু কোনো রকমে পা চালাতে থাকি।
তখনই মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলেন একজন মানুষ। অবয়ব দেখে মনে হলো রহমত সরদার। ধার্মিক মানুষ তিনি। তাকে পেয়ে যেন সাহস ফিরে পেলাম। তার সঙ্গে কিছুদূর এলাম। অনেক কথা বললাম, তিনি কোনো উত্তর দিলেন না! হঠাৎ মনে হলো, অদ্ভুত! তার মাথাটা দেখা যাচ্ছে না কেন! তারপর নিজে নিজে বললাম, ‘ধুর, মাথা ছাড়া মানুষ হয় নাকি?’
টিপটিপ বৃষ্টি আর হচ্ছে না। আমিও বাড়িতে পৌঁছে গেছি। আমাকে দেখেই মা হারিকেন নিয়ে এগিয়ে এলেন। অনেক দিন পর মাকে দেখে সব ভুলে গেলাম।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হয়নি! বিকালে মাঠে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে যা শুনলাম তাতে বাকরুদ্ধ। আরও এক সপ্তাহ আগে রহমত সরদার অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। তার মাথা পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়। তখন গত রাতের কথা মনে পড়ে। আমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। একসঙ্গে চলার কিছুক্ষণ পর তার মাথা দেখিনি!






