চা বাগানের অশরীরী
নৈশভোজের পরে

আঁকা : অনন্যা প্রমা
চা বাগান ঘিরে ভুতুড়ে ঘটনার অভাব নেই। এর কোনো কোনোটির জাগতিক ব্যাখ্যাও আছে। ইউপিএল থেকে প্রকাশিত ‘মাই লাইফ ইন টি’ বইতে এ ধরনের অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন টি প্ল্যান্টার আনোয়ারুল আজিম
আমার বন্ধু জিশান রাতে যেকোনো ছায়াকেই ভূত ভাবত। একবার সে ক্লিভডন বাংলোয় (মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-জুড়ী এলাকায়) আমার সঙ্গে নৈশভোজ করতে আসে। অতিথিদের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট শৌচাগারে ঢোকার জন্য দরজা খুলতেই এক হাড় হিম করা চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে পিছিয়ে আসে সে। তার দাবি, ভেতরে কোনো এক ছায়ামূর্তির উপস্থিতি দেখেছে। ক্লিভডন বাংলোটি এমনিতেই অতীত থেকে চলে আসা অজস্র ভুতুড়ে গল্পে ভরা ছিল, যেখানে জ্যোৎস্না রাতে ড্রাইভওয়ে ধরে ধোঁয়াটে ছায়াশরীর ভেসে বেড়াত বলে রটনা ছিল। স্বভাবসুলভ কৌতূহল থেকে আমি ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে নেমে দেখতে পেলাম, দরজার ঠিক বিপরীতে রাখা ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় জিশান আসলে নিজের ছায়াই দেখেছিল! তবুও সে মানতে রাজি হলো না। তার ধারণা ছিল, ভেতরে নিশ্চয়ই গা ছমছমে কিছু একটা ছিল, যা আমরা সবাই ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে গেছে।
তথাকথিত ‘ভূতের’ সঙ্গে আমার নিজের সাক্ষাৎ ঘটেছিল শুধু দুবার। ১৯৭৩ সালের শুরুর দিকের এক সন্ধ্যায় লস্করপুর ক্লাব (হবিগঞ্জের চুনারুঘাট) থেকে মোটরবাইকে করে নালুয়ায় ফিরছিলাম। বাংলোর প্রবেশপথ পেরোনোর সময় রাস্তার ধারের চা-গাছের সারির ভেতরে এক অস্বাভাবিক লম্বা মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। মুহূর্তে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। তবে সাহসে ভর করে বাইক থামালাম, ঘোরালাম এবং গাড়িটার তীব্র হেডলাইটের আলো ফেললাম সেই ‘বস্তুটির’ ওপর। তারপর একচোট হেসে নিলাম। ওটি ছিল একটি ইন্ডিগোফেরা গাছ, যা দুই সপ্তাহ আগে ১০ ফুট উঁচুতে কেটে ছেঁটে দেওয়া হয়েছিল। গাছের মাথায় নতুন গজানো পাতাগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো মানুষের মাথার বোলার হ্যাট বা টুপি! আমি যদি সেদিন ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতাম, তবে নালুয়ায় দেখা পাওয়া সেই অতিকায় লম্বা মানুষের গল্প পরদিনই বাগানের মুখে মুখে চাউর হয়ে যেত।
‘পরলোক থেকে ফিরে আসা’ তথাকথিত আত্মাদের সঙ্গে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাৎটি ঘটেছিল এর কয়েক বছর পর। ততদিনে আমি বিবাহিত এবং আমাদের প্রথম সন্তান এসে গেছে। স্ত্রী নাদিরা ও ছোট শিশু সাবিহকে নিয়ে মাইজদিহিতে (শ্রীমঙ্গল) এক নৈশভোজ শেষে বাগানে ফিরছিলাম। সময়টা গভীর রাত। আমি দেখলাম, কোমর পর্যন্ত অনাবৃত এবং কাদা দিয়ে ঢাকা এক নারী রাস্তার ধারের একটি নালায় দাঁড়িয়ে আছে। নাদিরা তখন ঝিমোচ্ছিল। তাই ভাগ্যবশত দৃশ্যটি তার চোখে পড়েনি। আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম, তবে সঙ্গে পরিবার থাকায় গাড়ি থামাইনি। পেছনের আসন থেকে ড্রাইভার সালামত ফিসফিস করে বলে উঠেছিল, ‘সাব, এইথো একথো শাইতান রহা!’ কিন্তু আমি আজও বিশ্বাস করি, ওটি ছিল এক হারিয়ে যাওয়া, মানসিক ভারসাম্যহীন নিঃস্ব নারী। গাড়ি থামিয়ে খোঁজ নিলে হয়তো কোনো যুক্তিযুক্ত উত্তর পাওয়া যেত।
বাংলোর গৃহপরিচারকরা আমাকে কখনো ভূতের গল্প শোনাত না। আর ভালো কথা হলো, বিভিন্ন বাংলোর পার্টিতে শোনা ভূতের গল্পগুলো নাদিরাকেও খুব একটা প্রভাবিত করতে পারেনি। ভূত যদি সত্যি থেকে থাকে, তবে তারা দয়ালুভাবেই আমাদের নিজেদের মতো থাকতে দিয়েছিল!



