অতি প্রাকৃত
নাগাল্যান্ডের উল্টো পায়ের অশরীরী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি জঙ্গলে বাস করা মানুষরা বলে উল্টো পায়ের অশরীরীর কথা। তার নানা কাণ্ড নিয়ে লিখেছেন আগামীর সময়-এর মিজোরাম প্রতিনিধি শিভাশিষ ভট্টাচার্য
নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি জঙ্গলের চেহারা সন্ধ্যা নামার পর সম্পূর্ণ বদলে যায়। এমন অনেক পথ আছে, যেগুলো দিনের বেলায় পরিচিত হলেও রাত নামলে যেন নিজের চেহারা বদলে ফেলে। স্থানীয়দের কেউ বলে, গভীর জঙ্গলে কখনো কখনো অচেনা কান্নার শব্দ শোনা যায়। কেউ বলে, অন্ধকারে পেছন থেকে পায়ের শব্দ আসে; কিন্তু ঘুরে তাকালে কাউকে দেখা যায় না।
আবার কেউ কেউ এখনো বিশ্বাস করেন, জঙ্গলের কিছু পথ এমন আছে, যেখানে রাতের পর মানুষ একা হাঁটলে তার সঙ্গে আর একজন অদৃশ্য সঙ্গী হাঁটতে শুরু করে। নাগাল্যান্ডের লোককথায় অংলেমলা এক রহস্যময় অশরীরী। ছোট, লোমে ঢাকা শরীর, লম্বা চুল আর পেছনের দিকে ঘোরানো পা— এই অস্বাভাবিক চেহারার জন্যই তার গল্প আলাদা। বলা হয়, গভীর জঙ্গলে তার কান্না শোনা যায়। তাকে দেখা বা উল্টো পায়ের ছাপ পাওয়া অমঙ্গলের লক্ষণ।
সেদিন আতোর বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। এমন কিছু নয় যে খুব রাত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শীতের সময় পাহাড়ে অন্ধকার খুব তাড়াতাড়ি নামে। মা সবসময় একই কথা বলেন, ‘সন্ধ্যার পর জঙ্গলের পথ ধরিস না।’
আতো প্রতিবারই হেসে উত্তর দেয়, ‘এই পথ আমি চোখ বন্ধ করেও চিনি।’
আলোটা জ্বালিয়ে সে জঙ্গলের পথে ঢুকে গেল। পথটা তার পরিচিত। বাঁ দিকে শুকনো ঝরনা। তারপর বড় একটি গাছ পেরিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া সরু রাস্তা। আতো ছোটবেলা থেকে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেছে; কখনো বন্ধুদের সঙ্গে, কখনো বাবার সঙ্গে, কখনো একাই।
হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবছিল, বাড়ি গিয়ে মায়ের রান্না করা ভাত খাবে। হয়তো আজ বাঁশকোরল দিয়ে তরকারি হয়েছে। তখনই পেছনে শুকনো পাতার ওপর শব্দ হলো। খস্। আতো থামল। মনে হলো, কোনো ছোট প্রাণী হবে। আবার হাঁটল। কিছুক্ষণ পর আবার— খস্।
মা সবসময় একই কথা বলেন, ‘সন্ধ্যার পর জঙ্গলের পথ ধরিস না।’ আতো হেসে উত্তর দেয়, ‘এই পথ চোখ বন্ধ করেও চিনি।’
এবার একটু কাছে। সে টর্চটা পেছনে ধরল। আলোয় ধরা পড়ল গাছের গুঁড়ি। ঝোপ। ভেজা পাতা। কেউ নেই।
আরও কিছুদূর যাওয়ার পর আতো খেয়াল করল, পেছনের শব্দটা তার হাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। সে হাঁটছে— শব্দ। সে থামছে— শব্দ থামছে।
আতোর মনে হলো, এখন যদি মা থাকতেন, তিনি নিশ্চয়ই বলতেন, ‘বলেছিলাম না, সন্ধ্যার পরে যাস না।’
তারপর মনে হলো— কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকল।
খুব আস্তে, ‘আতো...।’
সে থেমে গেল। আবার হাঁটল। কিছুক্ষণ পর আবার, ‘আতো...।’
খুব দূর থেকে একটা কান্নার মতো শব্দ।
একবার। তারপর থেমে গেল। আতোর মুখ শুকিয়ে গেল।
এই শব্দটা সে আগে শুনেছে। ছোটবেলায় দাদুর মুখে অংলেমলার গল্প শুনেছিল।
তখন গল্পটা শুনে সে হেসেছিল।
দাদু বলেছিলেন, ‘অংলেমলার পা উল্টো।’
আতো জিজ্ঞেস করেছিল, ‘উল্টো পা আবার হয় নাকি?’
দাদু হেসে বলেছিলেন, ‘যেদিন দেখবি, সেদিন বুঝবি।’
এখন হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আতো আলো মাটিতে ফেলল। ভেজা মাটিতে পায়ের ছাপ। একটি। তারপর আরেকটি। ছোট। জঙ্গলের এত ভেতরে কোনো শিশু আসবে কেন?
সে আরও কাছে গেল। তারপর দেখল— পায়ের আঙুলগুলো তার দিকে। আতো কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দাদুর গল্পের সেই কথাটা তার মাথায় ফিরে এলো। অংলেমলা। এবার সত্যিই ভয় পেল।
মাথা তুলে চারদিকে তাকাল। কিছু নেই।
তারপর— একটা গাছের পেছন থেকে যেন চুলের গোছা নড়ে উঠল।
তারপর শুনল— কেউ খুব আস্তে হাসল।
সে দৌড়াল। পাহাড়ি পথে দৌড়ানো সহজ নয়। পাথর। গাছের শিকড়। ভেজা পাতা। একবার পা পিছলে পড়ে যেতে যেতে সামলে নিল।
পেছন থেকে তখনো শব্দ আসছে। তারপর পেছন থেকে আবার তার নাম, ‘আতো...।’
কেউ তার কানের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। সে প্রায় ঘুরে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই মায়ের কথা মনে পড়ল, ‘যদি কখনো জঙ্গলে ভয় লাগে, পেছনে তাকাস না।’
সে তাকাল না। গ্রামের আলো দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ তার টর্চটা নিভে গেল।
তারপর সামনে একটা শব্দ। কেউ মাটিতে পা রাখল। আতো ধীরে ধীরে মাথা তুলল। গাছের পাশে একজন দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা চুল। শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে ছোট। চুলের ফাঁক দিয়ে মুখ দেখা যাচ্ছে না। শরীরটা যেন লোমে ঢাকা। অবয়বটি নড়ল। এক পা এগিয়ে এলো।
আতোর চোখ এবার তার পায়ের দিকে গেল। পায়ের পাতা পেছনের দিকে ঘোরানো। পায়ের আঙুল— তার দিকে।
আতো পরে বলেছিল, অংলেমলাকে দেখার মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল, সে যেন নিজের বাড়ির উঠোন দেখতে পাচ্ছে। মায়ের মুখ। আগুনের পাশে রাখা হাঁড়ি। দরজার কাছে জ্বলতে থাকা ছোট বাতি।
সে বুঝতে পেরেছিল— সে বাড়ি ফিরতে চায়। কিন্তু তার পা নড়ছিল না।
অবয়বটি আরও এক পা এগিয়ে এলো। তারপর সেই কান্না। আতো চোখ বন্ধ করল। আর দৌড়াল।
কীভাবে সে গ্রামের রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, সে জানে না। পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা তাকে জঙ্গলের শেষ বাঁকের কাছে পেয়েছিল।
কাপড় কাদায় ভেজা। হাতে আঁচড়। মুখ ফ্যাকাশে। মা তার মাথায় হাত রেখে বসেছিলেন।



