ভুট্টা দানার প্রতিমায় সাজল মণ্ডপ

গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় নাটোর শহর যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন শহরের উত্তর চৌকিরপাড় শ্রীশ্রী রামচন্দ্র মন্দিরে শুরু হয় অন্যরকম এক কর্মযজ্ঞ। দিনভর নানা ব্যস্ততা ও কাজকর্ম সেরে এই মন্দিরে একে একে জড়ো হন একদল তরুণ। রাতের এই নিরিবিলি পরিবেশেই নিখুঁত ও সুন্দরভাবে কাজ করার সুযোগ পান তারা। প্রথমে কাঠ, বাঁশ ও বিচালির কাঠামো তৈরি করে তাতে মাটি দিয়ে প্রতিমার অবয়ব আনা হয়। সেই মাটি শুকানোর পর শুরু হয় আসল জাদু। বিশাল দাস, পৃথিবী গৌসামি কিংবা প্লাবন চৌধুরীর মতো ৮-১০ জন তরুণ ও যুবক দীর্ঘ দুই মাস রাত জেগে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন এই অনবদ্য শিল্পকর্ম। তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও সাহসিকতা থেকেই এ বছর জন্ম নিয়েছে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন— ভুট্টা দানায় শোভিত প্রতিমা।
নাটোরে এবার মাটির প্রচলিত প্রতিমার গায়ে আঠার সাহায্যে সুনিপুণভাবে বসানো হয়েছে সোনালি রঙের ভুট্টার দানা। শ্রীশ্রী রামচন্দ্র মন্দিরের পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিধান চন্দ্র দেবনাথের তথ্যে জানা যায়, প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কিছু একটা ব্যতিক্রমধর্মী করার ইচ্ছা ছিল তাদের। সেখান থেকেই এলাকার ছোটরা সাহস করে ভুট্টা দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেয়। এর জন্য প্রায় তিন মণ ভুট্টা কেনা হয়।
প্রতিমার শরীরে ভুট্টা লাগানো অত্যন্ত কষ্টের ও ধৈর্যের কাজ হওয়ায় ভুট্টার দানাগুলো আলাদাভাবে বেছে নিয়ে তুলির সাহায্যে আঠা দিয়ে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তা বসাতে হয়েছে। কেবল দেবী দুর্গা নন; অসুর, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও সিংহ— সব প্রতিমাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই নান্দনিক সোনালি আবরণে। মাত্র ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে তৈরি এই ব্যতিক্রমী প্রতিমার দিকে তাকালে মনে হয়, যেন চারপাশে স্নিগ্ধ সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে।
মন্দিরে আসা স্থানীয় দর্শনার্থী বা ভক্তরা তো বটেই; অনলাইনেও দেশ-বিদেশের বহু মানুষ এই কাজের ভূয়সী প্রশংসা করছেন।
নাটোর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি খগেন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠেও ঝরে পড়েছে প্রশংসা, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি শিল্পীদের এক অনন্য শিল্পকর্ম, যার মধ্য দিয়ে অতীতের পাট, ধান ও ডালের প্রতিমা তৈরির ধারাবাহিকতায় এবারের ভুট্টার দানার এই শিল্পকর্ম দর্শনার্থী ও ভক্তদের মধ্যে দারুণ আগ্রহ ও মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছে।



