গহিন আমাজনে এক বাংলাদেশি

যুক্তরাজ্য থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে, ফ্যাশন ডিজাইনের ঝলমলে ক্যারিয়ার গড়েও মন টিকছিল না। জীবনটা একসময় সোনার খাঁচা মনে হতে লাগল। একপর্যায়ে সব ছেড়ে পাড়ি জমালেন গহিন আমাজনে। মাহফুজ রাসেল রোমাঞ্চকর সেই গল্প শুনিয়েছেন ইশতিয়াক হাসানকে
২০১২ সালের এপ্রিলের কোনো একদিন। লন্ডন থেকে রিও ডি জেনিরো হয়ে পৌঁছালাম আমাজোনাস রাজ্যের রাজধানী মানাউসে। বিমানের দরজা খুলতেই গায়ে ধাক্কা দিল তীব্র ভ্যাপসা গরম আর আর্দ্রতা। এ শহরকেই বলা হয় ‘আমাজনের প্রবেশদ্বার’। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ আদিম ধারায় বেঁচে থাকা কোনো আদিবাসী পরিবারের সঙ্গে থেকে যাওয়া।
পাগলাটে এক লোক
বহু কাঠখড় পুড়িয়ে মানাউসের কাছে তুপে আদিবাসীদের গ্রামে গিয়ে কয়েকটা দিন কাটালাম। তবে ওদের জীবন এখন অনেকটাই আরোপিত, পর্যটকনির্ভর। মানাউসে ফিরে ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে পেলাম শহরের ছকে আটকে পড়া এক খাপছাড়া, আধপাগলা লোককে, যার বেড়ে ওঠা আমাজনের দুর্গমে। সে জানাল, আমাজনের গহিন পাড়ায় তার ভাইয়ের পরিবারের কাছে আমাকে নিয়ে যেতে পারবে।
একা তার সঙ্গে গভীর জঙ্গলে যেতে সাহস পাচ্ছিলাম না। শেষমেশ বহু কষ্টে রাজি করালাম মানাউসে এসে অন্তরঙ্গ হওয়া জুলিয়ানাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এই তরুণী। নির্দিষ্ট দিন ভোরবেলা মানাউসের ঘাটে গিয়ে দেখি— মানুষ, বস্তা আর নানা মালামালে ঠাসা এক বিশাল ভাসমান বজরা প্রস্তুত। রিও নেগ্রোর কালচে জলের বুক চিরে ভেনেজুয়েলার দিকে ছোটাই এর কাজ। ইঞ্জিন ভটভট করে ডেকে উঠল; ব্যাকপ্যাক কাঁধে সভ্যতার শেষ সীমানা পেরিয়ে হারিয়ে গেলাম চিরসবুজ অরণ্যে।
অন্তত জনাপঞ্চাশেক যাত্রী, হাঁস-মুরগি আর মালামালের গন্ধে ঠাসা সেই নৌকাই ছিল আমাদের অস্থায়ী জগৎ। ছয়-সাত দিন পর এক ঘাটে নৌকা নামতে জুলিয়ানা বিদায় নিল স্পিডবোটে করে।স্বপ্ন যখন সত্যি হলো
১২-১৩ দিন চলার পর আমরা পৌঁছালাম সান্তা ইসাবেল নামের এক বাজারে। সেখান থেকে একটা ছোট ক্যানু ভাড়া নিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম রিও নেগ্রোর এক শাখা নদীতে। গাছগাছালির পচা পাতায় নদীর পানি কফির মতো কুচকুচে কালো। রোদও সেই জটলা ভেদ করে নিচে নামতে পারে না। পাঁচ-ছয় ঘণ্টার রোমাঞ্চকর ক্যানু যাত্রার পর সন্ধ্যার আবছা আলোয় চোখে পড়ল নদীর তীরে কাঠের খুঁটির ওপর বানানো ভাসমান ঘর— প্যালাফিতা। গন্তব্যে পৌঁছে গেছি!
ঘরের বাসিন্দারা নদীর পাড়ে নেমে এলো— আমার গাইডের ভাই, তার স্ত্রী, দুই ছেলে (প্রেতো ও রুডলফো), দুই মেয়ে (বড় ইওনি ও ছোট ক্যারোলিন) এবং এক তরুণ আত্মীয়। তারা মাকু আদিবাসী— যাদের জীবন সম্পূর্ণ নদীকেন্দ্রিক। প্রথম রাতে কুপিবাতি নিভে যাওয়ার পর অমানিশার অন্ধকারে নদীর পাড়ে গোলঘরে হ্যামক (ঝুলন্ত বিছানা) টাঙিয়ে শুয়ে পড়লাম। দুদিন বাদে আধপাগলা লোকটি আমাকে রেখে বিদায় নিল।
প্রথম প্রথম তারা আমার সঙ্গে কোনো কথাই বলত না। খাবার সময় হলে পাশে গিয়ে বসতাম। রান্না বলতে খুব সাধারণ— নদীর পানি আর লবণ দিয়ে সিদ্ধ করা মাছ বা মাংস, সঙ্গে দানাদার ফারিনহা। ফারিনহা তৈরি হয় কাসাভা মূল থেকে।
শিকার অভিযান
ওদের দলে ভিড়ে যেতে একদিন আমি বাবা আর ভাইদের সঙ্গে খালি পায়ে জঙ্গলে শিকারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু কিছুদূর যেতেই বুঝলাম, চামড়ার জুতোর চেয়েও শক্ত আদিবাসীদের পায়ের নিচের চামড়া! কাঁটা আর ডালের খোঁচায় আমার পা রক্তাক্ত হয়ে গেল। জঙ্গলে চলার প্রধান হাতিয়ার ছিল ম্যাচেটি (এক ধরনের বিশেষ লম্বা দা)। পথ কাটা, শিকার, কাঠ কাটা বা নৌকা বানানো— সবকিছুতেই ম্যাচেটি অপরিহার্য। ক্যানুতে করে কালচে নদীর ভেতর দিয়ে জলপথে যাওয়ার সময় বুকের ভেতর ধুকধুক করছিল— এই বুঝি অ্যানাকোন্ডা পেঁচিয়ে ধরল, কিংবা তীরের ঝোপ থেকে লাফিয়ে পড়ল জাগুয়ার! প্রথম শিকারে আমরা পেলাম এক পাকা। এটি ৭-১০ কেজি ওজনের ছাগল সাইজের এক প্রকার চতুর ইঁদুরজাতীয় প্রাণী। এর মাংস সিদ্ধ করেই তৈরি হলো রাতের আহার।
নদীতে দিনে তিনবার মাছ ধরা তাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু খাবারের জন্য নয়, সময় কাটানো ও আনন্দের জন্যও তারা মাছ ধরত। আরাকু, পিরানহা, টুকুনারেসহ হরেক পদের মাছ পেতাম আমরা। রাতে লম্বা দড়িতে হুক বেঁধে নদীতে ফেলে রেখে ঘুমাতে যেতাম; সকালে উঠে দেখতাম হুকে আটকা পড়েছে বিশালাকার ক্যাটফিশ।
অদৃশ্য বন্ধন
এক বিকালে প্যালাফিতার উঠানে সবাই বসেছিলাম। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, দূরে টিয়া পাখির ডাক। হঠাৎ আমার গা শিউরে উঠল, মনে হলো পেছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরতে চাইছে। পেছনে তাকাতেই মা (গৃহকর্ত্রী) নরম হাত বাড়ালেন। পরমুহূর্তেই আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন।
একে একে বোন ইওনি আর ক্যারোলিন এসে জড়িয়ে ধরল। আমরা চারজন কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম। কোনো কথা হয়নি, কিন্তু এক অদৃশ্য টানে আমি সেই অরণ্যের পরিবারের বড় ছেলে হয়ে উঠলাম! এরপর থেকে তারা আমাকে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে সব জানাত। আমি মাকে ডাকতে লাগলাম ‘মাই’ (মা)। আমি তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেলাম— হাফপ্যান্ট পরে, খালি গায়ে মাছ ধরে, কাসাভা ক্ষেতে কাজ করে দিন কাটতে লাগল।
গভীর অরণ্যের ডাক
দিন গড়িয়ে মাস পার হতে লাগল। গ্রামের মাত্র ১১টি পরিবার প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বাস করে। একদিন আমরা গ্রামবাসী মিলে বোট নিয়ে বের হলাম কয়েকশ কিলোমিটার দূরের এক মহাশিকার অভিযানে। হাতে বানানো ছররা বন্দুক, বর্শা আর আগুনে তৈরি ধোঁয়া দিয়ে গভীর জঙ্গল থেকে আমরা শিকার করলাম ক্যাপিবারা (ভেড়ার আকারের ইঁদুরজাতীয় প্রাণী), হরিণ, অ্যান্টিলোপ এবং আস্ত একটি টাপির।
আমাজনের এই কালো জল আর ঘন সবুজ অরণ্য আমাকে নিঃশব্দে নতুন এক জীবন উপহার দিল। মাথার ওপর বিশালাকার গাছের চাঁদোয়া, নিচে পচা পাতা ও ভাঙা ডালের স্তূপ আর হাঁটু থেকে বুকসমান পানির নোংরা স্রোত। ছোট ভাই তো একবার একটা রাজকীয় জাগুয়ারকেও হারিয়ে দিয়েছিল নিজের সাহসে!
দোটানা
দিন যত গড়াচ্ছিল, মাকু পরিবারের সঙ্গে আমার আত্মিক টান তত গাঢ় হচ্ছিল। কিন্তু বুকের ভেতরে একটা কাঁটা বিঁধছিল— আমার জন্মদাত্রী মা নিশ্চয়ই ঢাকায় আমার চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারছেন না। দোটানায় মানসিকভাবে আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে, হ্যামকে শুয়ে একা একা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতাম, মাথার চুল টানতাম। ১০ দিন ধরে চরম মানসিক যন্ত্রণার পর অপরাধবোধ নিয়েই একদিন মাই ও পরিবারকে জানালাম— আমাকে ফিরে যেতে হবে। শুনেই মাইয়ের মুখটা শুকিয়ে গেল। মাই আর বোনেরা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। প্রায় চার মাস কাটিয়েছিলাম তাদের সঙ্গে।
বিদায়বেলায়
বিদায়ের আগে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে শেষবার নদীতে গিয়ে গাছে থাকা এক শ্লথ ধরেছিলাম। পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির এই প্রাণীটিকে আঘাত না করে পরম মমতায় গাছে পৌঁছে দিয়ে আমরা বনের গভীরে ঢুকেছিলাম।
অবশেষে সেই কষ্টের দিনটি এলো। আমাজন ছাড়ার দিন কয়েকবার পেছালেও এক ভোরে মাই, পাই (বাবা), দুই বোন আর বড় ভাই প্রেতো আমাকে ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে মূল বাজারে পৌঁছে দিতে চলল। বিষাদের কালো মেঘ সবার মুখে।
বাজারে গিয়ে দীর্ঘ সময় পর একটা বড় ইঞ্জিনের নৌকা মিলল। বিদায়ের মুহূর্তে আদিবাসীদের চাপা কষ্টের রূপ দেখলাম। তারা চিৎকার করে কাঁদে না— শুধু মাই আর দুই বোনের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল।











