‘আমার টোকাই আমার মতোই আছে’

নিজ বাসভবনে রফিকুন নবী
‘আপনার সৃষ্টি টোকাই কেমন আছে এখন?’
‘টোকাই নামটাকেই তো অনেকে এখন খারাপ অর্থে ব্যবহার করে। তবে আমার টোকাই আমার মতোই আছে; সহজ, সরল আর মাথামোটা।’
‘কী করে টোকাই এখন?’
‘সে শহর দেখে, মানুষের কথা শোনে। কখনো দার্শনিক হয়ে যায় আবার কখনো রাজনীতিবিদদের মতো কথা বলে।’
কথা বলতে বলতে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সামান্য হাসলেন দেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী বা সংক্ষেপে রনবী। ঢাকায় প্রথম এসেছিলেন ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে। তখন একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত অধ্যায় ঘটে গেছে। দেশ জুড়ে তার রেশ রয়ে গেছে। প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র রনবী সপরিবারে ঠাঁই নিয়েছিলেন ঢাকার নারিন্দায়। তারপর ৪৩ বছর কেটে গেছে পুরান ঢাকার ওই এলাকায়। আশির দশকের গোড়ার দিকে পুরনো শহরের আবাস ছেড়ে উঠে আসেন নতুন শহরে।
‘এতগুলো বছরে কেমন দেখলেন এই শহরকে? এই শহরে বসে আপনার টোকাইয়েরবা কেমন হলো শহর-দর্শন?’
‘একদা আমার দেখা এই শহরের ওপর দিয়ে বহু পরিবর্তনের স্রোত বয়ে গেছে। কত কী চোখের সামনে বদলে গেল! একটা সময়ে ঢাকা বলতে রেললাইনের ওপারে এখনকার পুরনো শহরটাকেই বোঝাত। তখন রেললাইনের এদিকে নতুর শহর সবেমাত্র তার ডালপালা বিস্তার করতে শুরু করেছে। গুলিস্তান, মতিঝিল পল্টন এলাকা গড়ে উঠছে।
মনে পড়ে নতুন শহরের খালি মাঠের মতো জায়গাগুলোতে বন্ধুরা দল বেঁধে ফুটবল খেলতে যেতাম। শহর তো বদলাবেই। কিন্তু এখন চারপাশে তাকালে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করে ভাবনার মধ্যে। মনে হয়, শহরটা তার হৃদয়টাকেই হারিয়ে ফেলেছে।’
‘আর আপনার টোকাই? শহরের ডাস্টবিনের ধারে বেড়ে ওঠা সর্বহারা বালকটি?’
‘টোকাই তো আসলে আমার অভিব্যক্তিরই এক ধরনের সম্প্রসারিত অংশ। আমি যেভাবে এ শহরকে দেখলাম ও সেভাবেই দেখে গেল। কিন্তু সে এমনটাই থাকবে রাস্তার ধারে; তার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটবে না এ শহরে। কথাটা নির্মম কিন্তু সত্য।’
আষাঢ় মাসের দুপুরের আকাশ তীব্র রোদে পুড়ে যাচ্ছে। পুড়ছে গোটা শহরটাও। মেট্রোরেল থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে কয়েকটা গলি টপকে রফিকুন নবীর বাড়ি। উঠানে অনেক গাছ মাথা তুলেছে। বসবার ঘরের দেয়ালে ঝুলছে তারই আঁকা বড় ছবি। এক পাশে আলমারিতে বই। মুখোমুখি বসে কথা বলতে বলতে এই শহরের পুরনো স্মৃতির ভেতরে যেন হারিয়ে গেলেন শিল্পী। এই শহরে বেড়ে ওঠার স্মৃতি ছলকে পড়ল। আজও পুরান ঢাকার বন্ধুদের কথা ভাবেন। তাদের সঙ্গে কত নির্ভার গল্পের দিন ছিল। সামান্য প্রাপ্তির মধ্যে কত আনন্দ ছিল! তাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে দেখাই হয় না। অথচ সেই পুরান ঢাকায় গল্পে গল্পে সুন্দর সময় অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের একদা। সেই স্মৃতিগুলো এখন মনের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে।
‘আপনি তো একটা সময়ে এই শহরে হেঁটে বেড়াতেন। এখনো হাঁটেন?’
হাত দিয়ে চোখের চশমাটাকে সঠিক অবস্থানে বসিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘শরীর অসুস্থ। এখন আর হাঁটতে পারি না। কিন্তু একটা সময়ে এ শহরের বহু রাস্তায় হেঁটেছি। কোনো কোনো সময়ে হাঁটতে হাঁটতেই টোকাইয়ের কার্টুন আঁকার প্লট মাথায় এসেছে।’
‘এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে এই শহুরে জীবন আপনার মনে বেদনা জাগিয়ে তোলে কোনো কারণে, কোনো অভাব বোধ...?’
‘বেদনা হয় মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে। একটা সময়ে এরকম ছিল না। শিল্পীরা, অভিনেতারা, সাহিত্যিকরা, সাংবাদিকরা— সবাই মিলে তাদের ভাবনার আদান-প্রদান করতেন। বিভিন্ন ধরনের মত আর ভাবনাকে জানতে পারতাম। সবাই মিলে একটি সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল।
কিন্তু এখন সেরকম আর হয় না। এই শহরে মানুষ একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। আমি যে বাড়িটায় বসবাস করি তার পাশে কারা থাকে তাদেরই তো চিনি না।’
‘শহরের সীমানা বদলে গেল, কাঠামো বদলাল, কিন্তু মানুষ কিছু কি পেল?’
মাথা নাড়লেন রনবী। একটু বিরতি নিয়ে বললেন, ‘আসলে মানুষের মর্যাল নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো কিছুর মধ্যে আমি আর সমন্বয় দেখতে পাই না। একটা ছত্রখান হয়ে যাওয়া বোধের বিস্তার দেখতে পাই।’
‘বয়স কত হলো এখন আপনার?’
‘চুরাশির কিছু বেশি হবে।’
‘এখন ছবি আঁকছেন?’
‘আঁকি। তবে আগের মতো গতিতে আঁকতে পারি না। তবে কার্টুন আঁকা বন্ধ করে দিয়েছি।’
বাবা রশীদউন নবীর ছবি আঁকার শখ ছিল। তাকে দেখেই ছবি আঁকায় আগ্রহ তৈরি হয়েছিল রনবীর।
তারপর এ শহরের জীবন প্রবাহের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে অসংখ্য ছবি আঁকা। শহরটাকে দেখা। জানতে চেয়েছিলাম, শহরটা আগের মতো থাকলে কি ভালো হতো?
আবারও সামান্য হেসে বললেন, ‘শহর তো বদলাবেই। এটাই তার ধর্ম। কিন্তু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে থাকল সবকিছু।’
‘আপনার টোকাইয়ের মতো কি কিছুটা?’
‘হবে হয়তো। তারও তো আমার মতোই ভাবনা তৈরি হয়।’




