দীর্ঘশ্বাস, শান্তি আর নীরব ভালোবাসার সাক্ষী...

হাতিরঝিল
এই শহরে সকাল হয় ইটের বাড়ির দেয়ালে সূর্যের আলো পড়ে, দুপুর হয় তীব্র যানজটে আর রাতের নিস্তব্ধতা ছিনিয়ে নেয় গাড়ি-ঘোড়ার অসহনীয় শব্দ। এখানে চাকা ঘোরে, পিচঢালা পথ তেতে ওঠে আর বহুতল ভবনের কাচগুলো রোদ প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু এই নির্মম, পাথুরে ঢাকার বুকেও একটা নরম হৃৎপিণ্ড আছে। তার নাম— হাতিরঝিল।
প্রতিদিনের ধুলোমাখা এ শহরের নিজস্ব কোনো কান্না নেই। কিন্তু দিনভর যে মানুষটা করপোরেট অফিসের চার দেয়ালে ফাইল আর ইমেইলের নিচে চাপা পড়ে থাকে, কিংবা যে ছেলেটা মধ্যবিত্তের হাজারটা হিসাব মেলাতে মেলাতে ক্লান্ত— সন্ধ্যায় তারা এসে দাঁড়ায় হাতিরঝিলের পাড়ের রেলিংয়ে। ঝিলের কালচে জলে যখন চারপাশের নিয়ন আলো ছায়া ফেলে, তখন সেই আলো-আঁধারির খেলায় মানুষ তার ভেতরের আসল মানুষটাকে খুঁজে পায়। এখানে কেউ একাকিত্ব ভুলে থাকতে আসে না বরং নিজের একাকিত্বকে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদতে আসে। পানির দিকে তাকিয়ে থাকা হাজারো চোখের ফোঁটা ফোঁটা জল অলক্ষ্যেই মিশে যায় হাতিরঝিলের বুকে।
কত বিচ্ছেদ আর ভাঙা মনের নীরব সাক্ষী এই ঝিল। আবার অনেক নতুন স্বপ্নেরও কারিগর। কনে দেখা আলোয় কত প্রেমিক-প্রেমিকা হাত ধরে এ লেকের পাড়ে জীবনের প্রথম রঙিন স্বপ্ন বুনেছে। প্লাস্টিকের কাপে ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়ে কত তরুণ জুটি একে অন্যকে বলেছে, ‘কঠিন সময়টা ঠিক কেটে যাবে, দেখো। আমি আছি তো।’ প্রিয় মানুষটাও হয়তো আস্থা রেখেছে এ সান্ত্বনায়। উল্টোটাও হয়েছে; এই ঝিলের পাড়েই কোনো এক সন্ধ্যায় হয়তো শেষবারের মতো একে অন্যের হাত ছেড়ে দিয়েছে দুটি মানুষ। পিছুটান ভুলে তারা হারিয়ে গেছে দুদিকে, শুধু হাতিরঝিল বয়ে নিয়ে চলেছে তাদের সেই শেষ বিকালের দীর্ঘশ্বাস।
ঢাকা শহরটা খুব নিষ্ঠুর, সে সবার কাছ থেকে নেয়। কিন্তু কাউকে কিছু দেওয়ার মতো রত্নভাণ্ডার তার নেই। এ শহর কাউকে সস্তায় ছাড় দেয় না। কিন্তু দিনশেষে এ শহরটাই এক ক্লান্ত মা হয়ে হাতিরঝিলের আঁচলটা পেতে দেয় তার সন্তানদের জন্য। এখানে এলে মনে হয়, ইট-পাথরের দেয়ালগুলো একটু দূরে সরে গেছে। মাথার ওপর আকাশটা একটু বড় হয়েছে আর বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য একটু বাতাস পাওয়া যাচ্ছে। তাইতো প্রতিদিনের কাজের ফাঁকেও এখানে ভিড় জমায় হাজারো মানুষ।
হাতিরঝিলের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। কথিত আছে, ভাওয়ালের রাজাদের হাতির দল ঢাকার পিলখানায় রাখা হতো। সেখান থেকে হাতিদের গোসল করাতে এ জলাভূমিতে আনা হতো বেগুনবাড়ি খাল দিয়ে। হাতির যাতায়াতের এই পথ এবং গোসলের জলাভূমিটিই কালক্রমে ‘হাতিরঝিল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এরপর ধীরে ধীরে একটা সময় অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দখলের কারণে এটি একটি বিশাল বর্জ্য ফেলার স্থানে পরিণত হয়। ২০০৭ সালে এই এলাকাকে দৃষ্টিনন্দন করার লক্ষ্যে সরকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়, যা ২০১৩ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এই ঝিলের আয়তন ৩০০ একরের বেশি। হাতিরঝিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উচ্চ আদালত একে ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ বা জনগণের সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
হাতিরঝিল শুধু বিনোদনকেন্দ্র নয়, এটি ঢাকার যানজট নিরসনে একটি যুগান্তকারী মাধ্যম। বাড্ডা, গুলশান, রামপুরা, মগবাজার এবং কারওয়ান বাজারের মধ্যে এটি একটি চমৎকার সংযোগ তৈরি করেছে এই ঝিল। অন্যদিকে তরুণ থেকে প্রবীণ সবার আড্ডাস্থল এই ঝিল। তাইতো ঝিলের মুক্ত মঞ্চ, এমফিথিয়েটার এবং ক্যাফেটারিয়াগুলো সবসময়ই থাকে সরগরম।
যদিও আজকাল হাতিরঝিল তার রূপ হারাতে বসেছে। বেশিরভাগ সময় মন্ত্রী, এমপির যাতায়াতের দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় এই ঝিল। ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলো চুরি বা নষ্ট হওয়ায় রাতে অপরাধ বেড়েছে। ভেঙে গেছে বসার জায়গাগুলো। এ ছাড়া যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতাও বেড়েছে।
তবুও এ শহর ঘুমালে জেগে থাকে হাতিরঝিল। রাত যত বাড়ে, হাতিরঝিলের চারপাশ তত শান্ত হতে থাকে। কিন্তু ঝিলের পানির মৃদু কলতান থামে না। সে যেন রাত জেগে পাহারা দেয় এই শহরের ঘুমন্ত, ক্লান্ত কোটি মানুষকে। এই ঝিল একটা গোপন ডায়েরি, যার পাতায় পাতায় লেখা আছে কোটি মানুষের ভালোবাসা, কান্না, প্রাপ্তি আর হারানোর গল্প।




