গল্পে ধাঁধা
দাদির সিন্দুক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দাদির সিন্দুকটা রুদ্র ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে। কালচে লোহার ভারী সিন্দুক। চার কোনায় পিতলের পাত। মাঝখানে বড় তালা। দাদি সবসময় চাবিটা আঁচলের সঙ্গে বেঁধে রাখতেন। রুদ্র একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘দাদি, সিন্দুকের ভেতরে কী আছে?’
দাদি হেসে বলেছিলেন, ‘এমন একটা জিনিস, যার দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না।’
তারপর দাদি মারা গেলেন। কিন্তু সিন্দুকটা রয়ে গেল। এক বৃষ্টির সকালে হঠাৎ মা চিৎকার করে উঠলেন, ‘রুদ্র! দাদির ঘরে আয়!’
ঘরে গিয়ে রুদ্র দেখল, সিন্দুকটা নেই। জানালা খোলা। মেঝেতে কাদামাখা পায়ের ছাপ। সবাই বলাবলি করতে লাগল, চোর হয়তো জানালা ভেঙে সিন্দুক নিয়ে গেছে।
কিন্তু রুদ্র সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নাড়ল। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, সারা রাত বৃষ্টি হলেও জানালার নিচের মাটিতে কোনো পায়ের ছাপ নেই। তা ছাড়া
এত বড় ও ভারী লোহার সিন্দুক কোনোভাবেই সাধারণ জানালার গরাদ ভেদ করে বাইরে বের করা সম্ভব নয়। তবে রুদ্র সে মুহূর্তে কিছু বলল না।
বাবা থানায় ফোন করে সব জানালেন। পুলিশ এসে ঘর ভালো করে দেখে গেল এবং ঘরের পেছনের দরজা ও চারপাশ ঘুরে বুঝতে পারল, সিন্দুকটি জানালা দিয়ে যায়নি, বরং ঘর থেকেই অন্য কোনো উপায়ে সরানো হয়েছে। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট ক্লু না পেয়ে পুলিশ চলে গেল।
পুলিশ চলে যাওয়ার পর রুদ্র তার বন্ধু নীলকে ডাকল। দুজন মিলে দাদির ঘরটা আবার খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে বিছানার তোশকের নিচ থেকে একটা খাম পেল। খামের ওপর লেখা, ‘সিন্দুক হারিয়ে গেলে এটা রুদ্রকে দিও।’
ভেতরে দাদির লেখা কয়েকটি লাইন— ‘সিন্দুকে কোনো গয়না নেই। আছে এমন একটি পুরনো জমির দলিল, যার জন্য একজন মানুষ বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছে। মনে রাখিস, এ ঘরের চাবিকাঠি শুধু আমাদের পরিবারের বিশ্বস্ত কারও কাছেই থাকে। এটা কেউ সরালে, সে নিজের স্বার্থে নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যই সরাবে।’
নীল অবাক হয়ে বলল, ‘দাদি কি তবে আগেই জানতেন?’
রুদ্র উত্তর দিল না, তবে সে ঘরটা আবার পরীক্ষা করতে গিয়ে মেঝেতে একটা সরু দাগ দেখতে পেল। দাগটি সিন্দুকের মূল জায়গা থেকে দরজা পর্যন্ত গেছে। নিচু হয়ে ভালো করে তাকিয়ে রুদ্র বুঝল, এটা সিন্দুক টানার দাগ নয়।
নীল জানতে চাইল, ‘তাহলে?’
রুদ্র বলল, ‘চাকার দাগ।’
দুজন মিলে দাগটি অনুসরণ করে বাড়ির পেছনের বারান্দায় গেল। সেখানে দাঁড় করানো আছে বাড়ির পুরনো মালপত্র বহন করার একটা ট্রলি। ট্রলির চাকায় সদ্য তেল দেওয়া হয়েছে। এটা দেখে রুদ্রর সব পরিষ্কার হয়ে গেল। কেউ জানালা দিয়ে নয়, বরং ঘরের দরজা খুলে ট্রলিতে করে ভারী সিন্দুকটি সাবধানে সরিয়ে নিয়েছে। আর এ কাজ ঘরের ভেতরের কেউ ছাড়া বাইরের কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়।
সেদিন বাড়িতে ছিলেন রুদ্রর বাবা-মা, কাজের মেয়ে রহিমা এবং দাদির একান্ত বিশ্বস্ত পুরনো লোক হাবিব চাচা। হাবিব চাচা পনেরো বছর ধরে এ বাড়িতে বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করছেন।
রুদ্র হাবিব চাচাকে ডেকে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘চাচা, সিন্দুকটা শেষ কবে দেখেছিলেন?’
—কাল সন্ধ্যায়, বাবা।
—আজ দাদির ঘরে কেউ গিয়েছিলেন?
—আমিই গিয়েছিলাম সকালে, ঘরটা একটু পরিষ্কার করতে আর জানালা খুলতে।
রুদ্র তখন হাবিব চাচার হাতের দিকে তাকাল। তার ডান হাতের আঙুলে কোনো তেলের
দাগ ছিল না, বরং তার হাতের কনুইয়ের কাপড়ে হালকা পুরনো রঙের একটা তেলের ছোপ লেগে ছিল।
রুদ্র প্রশ্ন করল, ‘চাচার ডান হাতের কাপড়ে এ তেলের দাগ কীসের?’ হাবিব চাচা হাতটা একটু লুকিয়ে ফেলে শান্ত গলায় বললেন, ‘সকালে বারান্দার ওই পুরনো ট্রলিটার চাকা জ্যাম হয়ে গিয়েছিল, সেটাই ঠিক করছিলাম তো, তাতেই হয়তো লেগেছে।’
রুদ্র আর কিছু বলল না। সে বুঝতে পারল, হাবিব চাচাই ট্রলি ব্যবহার করে সিন্দুকটি সরিয়েছেন। কিন্তু কেন?
সন্ধ্যায় দাদির পুরনো ছবির অ্যালবাম ঘাঁটতে গিয়ে সে একটা পুরনো ছবি পেল। ছবিতে দেখা যায়, বহু বছর আগে দাদি সিন্দুকের পাশে বসে আছেন, আর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ বয়সের হাবিব চাচা। ছবির পেছনের নোটে লেখা— ‘হাবিবদের পরিবারকে উচ্ছেদ করে জোর করে যে জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তার সাক্ষী এই সিন্দুক।’
রুদ্রর আর বুঝতে বাকি রইল না। বহু বছর আগে তাদের গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের জমি স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রতারণা করে দখল করেছিল। হাবিব চাচা মূলত সেই পরিবারেরই সন্তান, যিনি ছদ্মবেশে বা পরিচর্যা করে দীর্ঘদিন ধরে এ বাড়িতে আছেন আসল দলিলটি উদ্ধারের আশায়। দাদি বিষয়টি জানতেন এবং তিনি হাবিবের সততা বিশ্বাস করতেন বলেই দলিলটি তাকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দাদির আকস্মিক মৃত্যুতে হাবিব ভয় পেয়েছিলেন যে, রুদ্রর বাবা বা অন্য কেউ হয়তো দলিলটি ধ্বংস করে ফেলবে। তাই তিনি নিজেই সিন্দুকটি ট্রলিতে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিলেন যাতে দলিলটি উদ্ধার করা যায়।
রাতের দিকে হাবিব চাচাকে বাড়ির পেছনের বাগানের ছোট ঘরটার কাছে দেখা গেল। রুদ্র নিঃশব্দে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল।
হাবিব চাচা থমকে গেলেন। তিনি মলিন হেসে বললেন, ‘এত রাতে এখানে কী করো ছোকরা?’ রুদ্র সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সিন্দুকটা কোথায় চাচা? আর সেই দলিলটি?’
পাঠক, সত্যি কি হাবিব চাচা দলিলটি নিয়েছেন? রুদ্র কীভাবে বুঝেছিল?






