ভারতে কাগজপত্রহীন বাংলাদেশিদের বিক্ষোভের খবরটি সত্য নয়

ছবি: আগামীর সময়
সম্প্রতি কয়েকজন ভারতীয় ব্যবহারকারীর এক্স ও ফেসবুক পেজ থেকে বাংলাদেশের পতাকা হাতে লোকজনের একটি ভিড়ের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, ভারতে কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশি অভিবাসীরা প্রকাশ্যে বিক্ষোভ করছেন।
ভারতের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর মুম্বাইয়ে বিরোধীদের একটি বিক্ষোভও হয়। এরপর কিছু ব্যবহারকারী দাবি করেন, কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীরা নির্বাচনী “ভোটব্যাংক”— এ কারণে বিরোধী দলগুলো কথিত বাংলাদেশি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। কেউ কেউ আবার এসআইআর কেন প্রয়োজন, তার প্রমাণ হিসেবেও ভিডিওটি তুলে ধরেন।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত দাবিটি ভিত্তিহীন। ভিডিওটি প্রকৃতপক্ষে বিক্ষোভের দৃশ্য নয়, বরং একটি সাজানো প্রযোজনার জন্য ধারণ করা শুটিংয়ের দৃশ্য।
কী দাবি করা হচ্ছে?
গতকাল রবিবার থেকে বেশ কয়েকটি ফেসবুক প্রোফাইলে এবং এক্স একাউন্টে ২০ সেকেন্ডের ভিডিওটি আপলোড করা হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওটিতে বাংলাদেশের পতাকা এবং স্মুক ফ্লেয়ার হাতে বেশ কিছু মানুষকে একত্রিত হয়ে মিছিল বা বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘এগুলো বাংলাদেশের পতাকা আজ মুম্বাইতে উড়ানো হয়েছে..SIR-এর প্রতিবাদে...অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করাই এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য, কারণ এরাই বিরোধী দলের সেই ভোট ব্যাংক যা থেকে তারা জয়ী হয়!!তাই SIR-এর বিরোধিতা করা হচ্ছে’।
আসল ঘটনা কী?
ভিডিওটি যাচাই করে দেখা যায়, এটি কোনো বিক্ষোভের দৃশ্য নয়। ভিড়ের পাশেই একটি ক্রেন লাগানো পেশাদার ভিডিও ক্যামেরা চলতে দেখা যায়, যা নিয়ন্ত্রিত কোণ থেকে অংশগ্রহণকারীদের দৃশ্য ধারণ করছে। মিছিলের গতিপথের সাথে তাল মিলিয়ে এই শুটিং সরঞ্জাম চলার বিষয়টি নিশ্চিত করে যে, এটি একটি সাজানো চলচ্চিত্র বা বিনোদনমূলক প্রযোজনার অংশ হিসেবে ধারণ করা হচ্ছিল।
ভারতের কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীও আলাদাভাবে এই শুটিংয়ের সরঞ্জামটি লক্ষ্য করেন এবং প্রচারিত দাবিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর মধ্যে এক্স অ্যাকাউন্ট ‘@TheVishalKay’ থেকে ও এই ভিডিওটি শেয়ার করে ক্যাপশানে লিখেন, ‘এটি কোনো সিনেমা বা সিরিজের শুটিং, বাস্তব জীবনের ঘটনা নয়। ক্যামেরার ট্রলি দেখা যাচ্ছে।’
আরও অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভারতভিত্তিক ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্যাক্ট মিথস’-এর সঙ্গে যুক্ত ফ্যাক্ট-চেকার বিশাল মহেশ্বরীও ভিডিওটি শেয়ার করে উল্লেখ করেন, ভিড়ের পাশ দিয়ে ক্রেনে বসানো পেশাদার ক্যামেরা চলছিল এবং ভিডিওটি একটি শুটিংয়ের দৃশ্য।
এছাড়া, ভারতভিত্তিক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ‘হিন্দ আখবার’ এবং ‘র্যাপিড রিপোর্টস’-এও একই ভিডিও খুঁজে পাওয়া গেছে। উভয় অ্যাকাউন্টই স্পষ্ট করেছে যে এটি বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রকৃত কোনো বিক্ষোভের দৃশ্য নয়, বরং সাজানো ভিডিও শুটিং।
তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্টভাবে কোনো চলচ্চিত্র, নাটক বা বিনোদনমূলক প্রযোজনার জন্য দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছিল তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলেও, ভাইরাল পোস্টে দেখানো বিক্ষোভটি কোনো অবৈধ বা কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশিরা করেছিলেন— এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদন, পুলিশের বক্তব্য বা সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। বিরোধী দলের সম্পৃক্ততা কিংবা অভিবাসীদের “ভোটব্যাংক” বানানোর অতিরিক্ত দাবিগুলোও কোনো প্রমাণ ছাড়াই ভিডিওটির সঙ্গে মনগড়াভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
অতএব, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও ও দাবিটি বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশের পতাকা থাকা সাজানো একটি শুটিংয়ের ভিডিওকে ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বিক্ষোভ হিসেবে তুলে ধরে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।





