মির্জা আব্বাসের আসন কি শূন্য হবে?

ছবি: আগামীর সময়
গত মার্চ মাসে পবিত্র রমজান চলাকালীন ইফতারের মুহূর্তে হঠাৎ জ্ঞান হারান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। দ্রুত তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি মেডিকেল টিম তাঁর মস্তিষ্কে জরুরি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ মার্চ তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয় এবং সেখানে টানা এক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর, চিকিৎসকদের পরামর্শে বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তাঁর শারীরিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে এবং আগামী জুন মাসে তিনি দেশে ফিরতে পারেন।
তিনি যখন দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে তাকে নিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক জল্পনা ও দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচার করা হচ্ছে যে, সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিন সংসদে উপস্থিত না থাকায় মির্জা আব্বাসের ঢাকা-৮ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি নেটিজেনদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য কিছু পোস্টে সংবিধানের ৬৭(১)(ক) অনুচ্ছেদেরও উল্লেখ করা হচ্ছে।
‘নাসির পাটোয়ারীর কপাল খুলে গেলো, মির্জা আব্বাসের আসন শূন্য’ কিংবা ‘না ওসমান হাদীর হইলো, আর না অন্য কেউ বসতে পারলো’—এমন নানা মুখরোচক ক্যাপশনে মুখর হয়ে উঠেছে অনলাইন। দাবি করা হচ্ছে, মির্জা আব্বাস সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ৯০ দিনের মাঝে শপথ গ্রহণ না করায় তাঁর সদস্যপদ বাতিল করে ঢাকা-৮ আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দাবিটি আইনি ও বাস্তবিকভাবে সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা ও মনগড়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই গুজবটি ছড়ানো হচ্ছে।
ইতোমধ্যে শপথ নিয়েছেন মির্জা আব্বাস
সংবিধানের ৬৭(১)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে যদি শপথ গ্রহণ বা শপথপত্রে স্বাক্ষর না করেন, তবে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার নিয়ম রয়েছে, যদিও স্পিকার চাইলে এই সময় বাড়াতে পারেন। তবে এই ধারাটি মির্জা আব্বাসের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়, কারণ তিনি ইতিমধ্যেই শপথ নিয়েছেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে বিএনপির অন্যান্য সংসদ সদস্যদের সঙ্গে মির্জা আব্বাস সশরীরে উপস্থিত থেকে শপথ গ্রহণ করেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও স্থিরচিত্রে দেখা যায়, তিনি তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশেই দাঁড়িয়ে শপথ নিচ্ছেন এবং শপথ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাও বলছেন। সুতরাং, তাঁর শপথ না নেওয়ার দাবিটি শুরুতেই খণ্ডিত হয়ে যায়।
সংবিধানের ‘৯০ দিন’ এবং কার্যদিবসের ভুল ব্যাখ্যা
অন্যদিকে, চিকিৎসাজনিত কারণে তিনি ৯০ দিন সংসদে অনুপস্থিত থাকায় তাঁর আসন শূন্য হয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে প্রচারকারীরা সংবিধানের ৬৭(১)(খ) অনুচ্ছেদের অপব্যাখ্যা করছেন। উক্ত অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদের অনুমতি না নিয়ে কোনো সদস্য যদি একাদিক্রমে ‘নব্বই বৈঠক-দিবস’ অনুপস্থিত থাকেন, তবেই তাঁর আসন শূন্য হবে। এখানে ‘দিন’ মানে ক্যালেন্ডারের সাধারণ দিন বা মাস নয়, বরং সংসদের সচল কার্যদিবস।
গাণিতিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল গত ১২ মার্চ এবং তা শেষ হয় ৩০ এপ্রিল, যেখানে পুরো অধিবেশনে মোট কার্যদিবস বা বৈঠক-দিবস ছিল মাত্র ২৫টি। সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এখনো শুরুই হয়নি এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের ১ দফায় দেওয়া ক্ষমতাবলে আগামী ৭ জুন দ্বিতীয় অধিবেশন আহ্বান করেছেন। অর্থাৎ, বর্তমান সংসদের জীবনকালই যেখানে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫ বৈঠক-দিবস, সেখানে কোনো সংসদ সদস্যের পক্ষে ‘একটানা ৯০ বৈঠক-দিবস’ অনুপস্থিত থাকার দাবিটি গাণিতিকভাবেই এক চরম অবান্তর বিষয়।
নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট অবস্থান
রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সংসদীয় আসন শূন্য হলে প্রথমে জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং এরপর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আসন শূন্য ঘোষণা করে উপ-নির্বাচনের তফসিল দেয়। কিন্তু অনুসন্ধানে গণমাধ্যম কিংবা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ঢাকা-৮ আসন নিয়ে এমন কোনো তথ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখার পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্ট করে জানান, ঢাকা-৮ আসন শূন্য ঘোষণা করার দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো ঘোষণাই দেওয়া হয়নি।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে এটি প্রমাণিত যে, ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস নিয়ম মেনেই যথাসময়ে শপথ নিয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি চিকিৎসাজনিত কারণে বিদেশে অবস্থান করলেও সংসদের কার্যদিবসের হিসাব অনুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হওয়ার কোনো আইনি পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং সংবিধানের অপব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।










