৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব
কান্নায় কথা বলতে পারছিলেন না ভিন ডিজেল

কান উৎসবের লালগালিচায় সহশিল্পীদের সঙ্গে ভিন ডিজেল (ছবি: রয়টার্স)
পেছনের অংশে জ্বলজ্বলে সিকুইন দিয়ে লেখা ‘ফাস্ট ফরেভার’ ও একটি গাড়ির আকৃতি। এমন কালো রঙের জ্যাকেট পরে লালগালিচায় হাজির হলিউড তারকা ভিন ডিজেল। ‘দ্য ফাস্ট অ্যান্ড দ্য ফিউরিয়াস’ মুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন করতে কান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিলেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন প্রয়াত পল ওয়াকারের ২৭ বছর বয়সী কন্যা মেডো ওয়াকার। ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ সিরিজের এই অভিনেতাকে স্মরণ করতে গিয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি ভিন ডিজেল।
গত বুধবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা ৪৫ মিনিট) মিডনাইট স্ক্রিনিং বিভাগে দেখানো হয় ‘দ্য ফাস্ট অ্যান্ড দ্য ফিউরিয়াস’। ফ্রান্সের দক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের তীরে পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে প্রদর্শনী শেষে দর্শক ও অতিথিরা দাঁড়িয়ে টানা চার মিনিট ছবিটির কলাকুশলীদের করতালিতে অভিবাদন জানান। তখনই ভিন ডিজেলের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে জল। নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বারবার কান্নায় আটকে গেছে তার কণ্ঠ।
আয়োজকরা অফিসিয়াল সিলেকশনে রেখে ‘দ্য ফাস্ট অ্যান্ড দ্য ফিউরিয়াস’কে ক্ল্যাসিক স্বীকৃতি দিয়েছে। এটাই ছিল আবেগাপ্লুত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বড় পর্দায় প্রয়াত সহশিল্পী পল ওয়াকারের সঙ্গে নিজের বন্ধুত্ব ও স্মৃতি আবার ভেসে ওঠায় ভিন ডিজেল আবেগাপ্লুত হয়ে যান। নিজেকে সামলে নিয়ে ৫৮ বছর বয়সী এই আমেরিকান তারকা বলেন, ‘প্রার্থনা করি, সবার জীবনে যেন পলের মতো একজন ভাই থাকে।’
ভিন ডিজেল যোগ করেন, ‘ছবিটি দেখা আমার জন্য খুব কঠিন। কারণ, এতে এমন অনেক মুহূর্ত আছে, যেগুলো আপনারা যেভাবে দেখেছেন, আমার চোখে সেগুলো ভিন্ন। একটি দৃশ্য আছে, যখন পাবলো (পল) আমাকে বলেছিল, তার এক বছরের একটি মেয়ে আছে।’
আবেগঘন বক্তব্যের শেষ অংশে মেডোকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরেন ভিন ডিজেল। তখন তিনি বলেন, “আজ সে আমাকে বলেছে— ‘আমার বয়স এখন ২৭ বছর। আমার বাবা তার ২৭ বছর বয়সে এই ছবিতে কাজ করেছেন।’ আমি ভাবলাম, কী গভীর ব্যাপার! মেডো আমাদের জন্য শক্তির বড় উৎস। আমি জানি, পল তোমাকে নিয়ে ভীষণ গর্ব করত।”
২০১৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হন পল ওয়াকার। ‘ফাস্ট টেন’ ছবিতে স্বল্প উপস্থিতির একটি চরিত্রে অভিনয় করেন তার মেয়ে মেডো।
ভিন ডিজেল ও তার সহশিল্পীদের ঘিরে জমে ওঠে তারকাখচিত লালগালিচার আয়োজন। বিশেষ করে ভিন ডিজেলকে ঘিরে তৈরি হয় ব্যাপক উন্মাদনা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা সারি সারি ভক্তদের কাছে ঘুরে ঘুরে তিনি সেলফি তুলেছেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। তার সঙ্গে ‘দ্য ফাস্ট অ্যান্ড দ্য ফিউরিয়াস’-এর দুই অভিনেত্রী মিশেল রড্রিগেজ ও জর্ডানা ব্রুস্টার আলো ছড়িয়েছেন লালগালিচায়।
গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে ভিন ডিজেলের কান্নায় সহশিল্পীরা আর পলের মেয়ে মেডো আবেগে চোখের জল মুছেছেন। তাদের পাশে ছিলেন ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ ফ্র্যাঞ্চাইজের নিয়মিত অভিনেতা টাইরিস গিবসন ও প্রযোজক নীল এইচ মরিৎজ, এনবিসি ইউনিভার্সাল এন্টারটেইনমেন্টের চেয়ারম্যান ডেম ডোনা ল্যাংলি। এর আগে প্রাণবন্ত ফটোকলে অংশ নেন তারা।
দর্শকভর্তি গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে মধ্যরাতের প্রদর্শনী শুরুর আগে কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমোঁকে উদ্দেশ করে ভিন ডিজেলের রসিকতা ছিল, ‘থিয়েরি, এত মানুষ কোথা থেকে আনলেন! জীবনে এমন মধ্যরাতের প্রদর্শনী কখনো দেখিনি। তা ছাড়া ছবিটা তো আর নতুন নয়!’
ভিন ডিজেলের ভাষ্য, “বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধান ২৫ বছর আগে নির্মিত আমাদের ছবিটিকে একটি ‘ক্ল্যাসিক’ বলছেন। এর চেয়ে গভীর ব্যাপার আর কী হতে পারে? কানে পৃথিবীর প্রত্যেক শিল্পী স্বীকৃতি ও সম্মান পেতে চান। এটা কতটা গভীর অনুভূতির বিষয়, ভাবুন তো!”
এরপর ভিন ডিজেল বলেন, “আজ দুপুরে আমাকে থিয়েরির বলা কিছু কথা কোনোদিন ভুলব না। তিনি বললেন, ‘ভিন, ৩১ বছর আগে একজন পরিচালক, গল্পকার ও অভিনেতা হিসেবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাল্টি-ফেসিয়াল’ নিয়ে তুমি এখানে এসেছিলে। তখন তোমার স্যুটকেসের আকার ছিল কাপড় রাখা ব্যাগের মতো। তখন পৃথিবীর কেউ তোমাকে চিনত না। কানে তোমার ফিরে আসা এত বিশেষ, কারণ আমার মনে হয়, তোমার জন্মই হয়েছে কানে।’ সত্যিই জীবনে তো আমি একবারই এখানে এসেছি!”
‘ফাস্ট ফরেভার’ লেখা জ্যাকেট পরে বিশ্বজয়ী এই ফ্র্যাঞ্চাইজের সমাপ্তির ইঙ্গিত দিলেন ভিন ডিজেল। ভক্তদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা ‘ফাস্ট’-এর শেষ চলচ্চিত্র বানাচ্ছি শুধুই আপনাদের জন্য। আপনারা আমাদের পরিবারের অংশ মনে করেছেন। সবাইকে ভালোবাসি।”
২০০১ সালের ২২ জুন মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ফাস্ট অ্যান্ড দ্য ফিউরিয়াস’ চলচ্চিত্রেই ডমিনিক টোরেটো চরিত্রে প্রথমবার দ্রুতগতির গাড়ির ইঞ্জিনে গর্জন তুলেছিলেন ভিন ডিজেল। ৩৮ মিলিয়ন ডলার বাজেটে রব কোহেন পরিচালিত ছবিটি বিশ্বব্যাপী ২০৭ মিলিয়ন ডলার আয় করে অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক সাফল্য পায়। ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ফাস্ট টেন’-এর নির্মাণ ব্যয় ছিল ৩০ কোটি ডলারের বেশি। ‘ফিউরিয়াস সেভেন’ এবং ‘দ্য ফেট অব দ্য ফিউরিয়াস’ দুটি ছবিই বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে।
ইউনিভার্সেল পিকচার্সের সবচেয়ে লাভজনক ও দীর্ঘমেয়াদি একটি ফ্র্যাঞ্চাইজ ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’। এর ১১টি চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসে আয় করেছে ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, সিরিজের নতুন রোমাঞ্চকর অধ্যায় ‘ফাস্ট ফরেভার’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ২০২৮ সালের ১৭ মার্চ। আবার পরিচালকের দায়িত্বে ফিরছেন ফ্রান্সের লুই লঁতেরিয়ের।
এদিকে এনবিসি ইউনিভার্সাল ঘোষণা দিয়েছে, ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ ফ্র্যাঞ্চাইজ অবলম্বনে নতুন টেলিভিশন সিরিজ ছোট পর্দায় আসছে। স্ট্রিমিং সেবা পিকক-এর জন্য তৈরি হচ্ছে এটি।







