হেনা স্যারের চলে যাবার ৩৭ বছর

আবু হেনা মোস্তফা কামাল। ছবি তৈরি এআই সহযোগে
খুব সম্ভবত তিনিই বাংলা একাডেমির একমাত্র মহাপরিচালক যিনি কর্মরত থাকা অবস্থাতেই হারিয়ে যান এই গ্রহ থেকে ওই অনন্ত নক্ষত্রে। যে বছর চলে যান তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র।
বাংলাদেশ টেলিভিশনই তখন ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। বাবাকে সাথে নিয়ে দেখছি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একটি অনুষ্ঠান। ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ রেকর্ড করা হয়েছিল। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ প্রচারিত হয়েছিল বিটিভিতে রাত আটটার বাংলা সংবাদের আগে বা পরে।
মনে আছে সেই অনুষ্ঠানে একজন অধ্যাপক খুবই গাম্ভীর্যের সাথে (উইদাউট স্ক্রিপ্ট) হেমন্ত মুখার্জীর সাথে আলাপ করছেন আর হেমন্ত বাবু তাঁর পছন্দের গান (আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে এটা গেয়েছেন মনে হয়) একটার পর একটা পরিবেশন করেই যাচ্ছেন। তখন নিবিড়ভাবে গান শোনা কিংবা এই ধরনের উচ্চমার্গীয় অনুষ্ঠান বোঝার বয়স হয়নি।
তুমি যে আমার কবিতা, কত সাধনায় এমন ভাগ্য মেলে, নদীর মাঝি বলে এসো নবীন, সেই চম্পা নদীর তীরে, অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে, যায় যদি যাক প্রাণ তবু দেব না দেব না দেব না গোলার ধান, অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিলে সেদিন বর্ণমালা, এই পৃথিবীর পান্থশালায় গাইতে গেলে গান, তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে এই রাত এমন মধুর, হাতের কাকন ফেলেছি খুলে, আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি-এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের কিংবদন্তি মানুষটি তিনি যিনি ছিলেন একাধারে গীতিকবি, প্রাবন্ধিক এবং শিক্ষাবিদ।
চলে গেলেন চিরতরে ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯। ঠিক তিনদিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ কলকাতায় দেহত্যাগ করলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
হেনা স্যারের শারীরিক প্রস্থানের ১৭ বছর পর বাংলা একাডেমিতে যোগদানের পর আলাপ করেছি অনেকের সাথে। জেনেছি তাঁর মতো এত মেধাবী মানুষ সহকর্মীরা কোনোদিন দেখেননি। সত্যিই তাই!
আলাপ হলো একদিন বাংলা একাডেমির সাবেক সহকর্মী শুকুর আলীর সাথে যিনি মহাপরিচালক মহোদয়ের দপ্তরে নানা সময়ে কাজ করেছেন।
একদিন তাকে বললাম, আমি একটি বার আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যারের কবরের সামনে দাঁড়াতে চাই। তখন মেস জীবন চলছিল মিরপুর-২ এ।
আমাকে শুকুর আলী ভাই বললেন, 'কাইল আমনে স্টাপ বাছে আমার লগে বইবেন বুছছুইন। আমরা দোনোজন আজিমপুর মুড়ে নাইমা যামু অপিস ঢোকোনোর আগে। তারপর এট্টুদূর হাইট্টা গ্যালেই আজিমপুর গুরস্থান পামু।
অর উলটাদিকে নোতুন আরেকখান গুরস্থান হইছে হেই জায়গায় স্যাররে কবর দেওন অইছে।' শুকুর আলী (টাঙ্গাইলের কালিহাতির মানুষ ছিলেন) বাংলা একাডেমিতে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেন ২০১৪ সালে।
যেটা বলছিলাম শুকুর আলীর সাথে আজিমপুর নতুন কবরস্থানে ঢোকার পর কয়েক সেকেন্ড হেঁটেই রাস্তার সাথেই পেলাম হেনা স্যারের কবর।
এপিটাফে লেখা ছিল 'দূর যাত্রার পারানি' তাঁরই লেখা কবিতার অংশ বিশেষ-
'আর কোনোদিন অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে
ফিরে আসবো না মধ্যরাতে,
দরজায় আর করাঘাত
বেজে উঠবে না অসময়ে
ঘর গেরস্থালি সচকিত ক'রে
জ্বলে উঠবে না ঘুমন্ত লণ্ঠন
কারো বিপর্যস্ত ছায়া খাবার টেবিলে
উবু হয়ে নেবেনা মিয়োনো ভাতের ঘ্রাণ, বিদায়!'




