এখনও মানুষ বলে আম্মাজান আসছে রাস্তা ছাড়ো

ছবি: আগামীর সময়
এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন অভিনেত্রী শবনম। তার সঙ্গে কথা বলেছেন মীর রাকিব হাসান
কেমন আছেন? এখন সময় কীভাবে কাটছে?
এখন মোটামুটি ভালোই কাটছে। আমার একমাত্র ছেলে রনি কাছে আছে। এটা একটি স্বস্তির বিষয়। তার বাবা মারা যাওয়ার পর সে আর লন্ডনে ফিরে যায়নি। আমার কাছেই রয়ে গেছে।
মায়েদের জীবন যেমন হয়, আমারও সেভাবেই কাটে। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ছেলেকে জিজ্ঞেস করি— কী খাবে, কী লাগবে। একজন মায়ের যে দায়িত্ব, সেগুলোই পালন করছি। বাসায় একটি মেয়ে আমাকে সাহায্য করে।
আপনার ছেলে কি ছোটবেলায় আপনার সিনেমা দেখত?
না, রনি আমার অভিনয় খুব একটা দেখত না। মনে হয় একটি সিনেমা দেখেছিল। সেই চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নায়ক নাদিম আমাকে চড় মেরেছিল। তখন তার বয়স চার বছর। সেই দৃশ্য দেখে সে অনেক কান্নাকাটি করে বলেছিল, ‘আমার মাকে কেন মারল!’ এরপর থেকে রনি আর মনোযোগ দিয়ে আমার সিনেমা দেখেনি।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন। কেমন অনুভূতি হচ্ছে?
এটি ভাষায় প্রকাশ করা খুব কঠিন। জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছি। পাকিস্তানে থাকার সময় বহুবার নিগার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। কিন্তু নিজের জন্মভূমিতে, নিজের দেশের মানুষের কাছ থেকে এই সম্মান পাওয়ার অনুভূতি একেবারেই আলাদা। এটি আমাকে ভীষণ আনন্দ দেয়। মনে হচ্ছে জীবনের বড় একটি প্রাপ্তি হলো।
এই মুহূর্তে কাকে বেশি মনে পড়ছে?
আমার স্বামী রবিন ঘোষকে খুব মনে পড়ছে। আজ আমি যেখানে পৌঁছেছি, এর পেছনে তার অবদান অনেক। মা-বাবার পরে আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন তিনি। আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। তাকে খুব মিস করছি।
‘আম্মাজান’-এর পর আর সিনেমায় অভিনয় করেননি কেন?
‘আম্মাজান’ মুক্তির পর যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটি অসাধারণ। এখনো মানুষ আমাকে দেখে বলে, ‘আম্মাজান আসছে, রাস্তা ছাড়ো।’ এই ভালোবাসা আমাকে খুব আনন্দ দেয়। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এর চেয়ে ভালো কোনো চরিত্র না পেলে আর অভিনয় করব না। তাই এরপর আর কাজ করা হয়নি। সবশেষ একজন স্ক্রিপ্ট নিয়ে এসেছিল। অগ্রিম সম্মানীও দিয়েছিল। কিন্তু পুরো স্ক্রিপ্ট পড়ে পছন্দ হয়নি। আমি বিনয়ের সঙ্গে না করে দিয়েছি এবং টাকা ফেরত দিয়েছি।
‘আম্মাজান’-এর কাজ করার পর এফডিসিতে আর গিয়েছিলেন?
বহু বছর যাইনি। একদিন হঠাৎ ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। শুক্রবার ছিল। ভাবলাম, যেহেতু এখান থেকেই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল, একবার দেখে যাই। গিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। চারদিকে শিল্পী, কলাকুশলী, মানুষের ভিড় থাকত। কিন্তু সেদিন দেখলাম সব ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। পুরনো মানুষ অনেকেই বেঁচে নেই। আমার ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল। একা একা কেঁদেছিলাম।
এখনো নাকি নিজে বাজার করতে যান?
হ্যাঁ, আল্লাহর রহমতে এখনো নিজের বাজার নিজেই করি। বয়স ৮০ পার হয়েছে, কিন্তু যতটা পারি নিজের কাজ নিজেই করে থাকি।
অবসর সময়ে কী করেন, নাটক-সিনেমা দেখেন বা বই পড়েন?
সত্যি বলতে, এখন টেলিভিশন দেখি বেশি। আর রবিনের (স্বামী রবিন ঘোষ) গান শুনি। তার গানগুলো এখনো আমার খুব ভালো লাগে। এসব গান কখনো পুরনো মনে হয় না। এখন টিভি দেখা আর গান শোনাই আমার সময় কাটানোর মাধ্যম।
বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে মৃত্যুর ভাবনা কি আসে?
মৃত্যু তো জীবনেরই অংশ। প্রায় প্রতিদিনই ভাবি— বিশেষ করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় মনে হয়, আগামীকাল সকালটা দেখতে পারব তো? আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন আরেকটা সকাল দেখতে পারি।
জীবনের কোনো অপূর্ণতা আছে?
অবশ্যই আছে। আমার সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা আমার ছেলেকে যথেষ্ট সময় দিতে না পারা। কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম, তাকে প্রয়োজনমতো সময় দিতে পারিনি। তার বয়স যখন নয় বছর, তখন থেকেই অনেকটা সময় বাইরে ছিল। ছুটিতে গেলে দেখা হতো, আমি যেতাম বা সে আসত। কিন্তু একজন মায়ের যেভাবে সন্তানের পাশে থাকা উচিত, সেভাবে থাকতে পারিনি। জীবনের এত সাফল্যের পরও এটাই আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ এবং অপূর্ণতা।





