খামেনির প্রতি কেন এত ক্ষোভ ইরানি নায়িকার?

গোলশিফতেহ ফারাহানি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মারা গেছেন। খামেনির মৃত্যু সংবাদ প্রকাশের পর ইরানি অভিনেত্রী গোলশিফতেহ ফারাহানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন একটি বার্তা দিয়েছেন। সংক্ষিপ্ত বার্তাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলে। তিনি লিখেছেন, ‘এই ৪৭ বছরে কত অমূল্য প্রাণ ঝরে গেছে… শুধু এটুকুই আশা করি, তারা যেন স্বর্গ থেকে অথবা তারও ওপার থেকে আজকের এই দৃশ্য দেখছে।’ তাঁর এই বক্তব্য অনেকের কাছে রাজনৈতিক মনে হলেও, বাস্তবে এটি বহু বছরের ব্যক্তিগত ক্ষত, নির্বাসন ও দমনের অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর আগে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন রুহুল্লাহ খোমেনি। খোমেনির মৃত্যুর পর ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। সেই থেকে প্রায় চার দশক ধরে তিনি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর শাসনামলে ইরানে রাজনৈতিক ভিন্নমত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নারীর অধিকার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বহুবার আন্তর্জাতিক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গোলশিফতেহ ফারাহানির জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। শৈশব থেকেই তিনি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছেন। তাঁর পরিবার থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু তিনি প্রথমে সংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কৈশোরে তিনি চুল কেটে ছেলে সেজে সাইকেল চালাতেন এবং ছেলেদের সঙ্গে খেলতেন, কারণ প্রকাশ্যে মেয়েদের চলাফেরায় ছিল নানা সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধ। সকালে স্কুলে হিজাব পরে যাওয়া আর বিকেলে ছেলে সেজে স্বাধীনভাবে চলাফেরা—এই দ্বৈত জীবন তাঁর মনে তীব্র প্রশ্ন তৈরি করে নারীর পরিচয় ও স্বাধীনতা নিয়ে।
২০০৮ সালে তাঁর জীবনে বড় মোড় আসে। ব্রিটিশ পরিচালক রিডলি স্কটের হলিউড ছবি ‘বডি অব লাইস’–এ অভিনয় করেন তিনি। সহশিল্পী ছিলেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও রাসেল ক্রো। ছবির শুটিং চলাকালে হিজাব না পরার কারণে ইরানে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে একটি শর্তে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়—তাঁকে দেশ ছাড়তে হবে। তিনি দুটি ব্যাগে নিজের সব স্মৃতি গুছিয়ে ইরান ছাড়েন।আর কখনো দেশে ফিরতে পারবেন কিনা তা-ও তার জানা ছিল না।
নির্বাসনের পরও বিতর্ক থামেনি। ২০১২ সালে ফরাসি ম্যাগাজিন ‘মাদাম ফিগারো’র জন্য খোলামেলা ফটোশুটে অংশ নেওয়ার পর ইরান সরকার জানায়, এমন শিল্পীর ইরানে কোনো প্রয়োজন নেই। তাঁর ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সেই মুহূর্ত থেকে তিনি কার্যত রাষ্ট্রবিহীন এক শিল্পীর জীবনযাপন শুরু করেন—যেখানে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি ক্ষোভ পাশাপাশি অবস্থান করে।
ফ্রান্সে বসবাস শুরু করার পর প্রথমদিকে তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও বন্দি মনে করতেন। পরে ধীরে ধীরে নতুন সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের লোকার্নো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের এক আলোচনায় তিনি নিজের নির্বাসন, হিজাব ইস্যু, শিল্পীজীবন ও পরিচয়ের সংকট নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, শিল্পই তাঁর বেঁচে থাকার শক্তি। একই সঙ্গে ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহির সাহসিকতার প্রশংসা করেন এবং জানান, কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও ইরানের শিল্পীরা সংস্কৃতির আত্মাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
ইরানকেন্দ্রিক গল্পে কাজ করতে দীর্ঘদিন অনীহা দেখালেও পরে এরান রিকলিসের ‘রিডিং ললিতা ইন তেহরান’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি এক শিক্ষিকার গল্প, যিনি গোপনে ছাত্রীদের নিষিদ্ধ সাহিত্য পড়ান। এই গল্পে ফারাহানি নিজের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান—এক নারীর প্রতিরোধ, জ্ঞান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে স্বাধীনতার অনুসন্ধান।
খামেনির মৃত্যুতে তাঁর প্রতিক্রিয়া শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং ব্যক্তিগত ইতিহাসের বহিঃপ্রকাশ। চার দশকের শাসন, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, নারীর শরীর ও পরিচয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ—এসবের সঙ্গে তাঁর নিজের জীবন জড়িয়ে গেছে। তিনি বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের সরল সমর্থক নন; বরং বহুবার বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও উগ্রবাদী শাসন—দুটোর বিরুদ্ধেই তাঁর অবস্থান। তাঁর পোস্টে যেমন ক্ষোভ আছে, তেমনি আছে দীর্ঘদিনের বেদনা, নির্বাসনের যন্ত্রণা এবং এক শিল্পীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।

