অস্কারে ইতিহাস গড়ার পথে জার্মানির সান্দ্রা হুলার

সান্দ্রা হুলার
জার্মান অভিনেত্রী সান্দ্রা হুলারের জন্য এ বছরটা দারুণ একসময় কাটছে। তার অভিনীত ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ যেমন কাঁপাচ্ছে বক্স অফিস, তেমনি কান উৎসবে ‘ফাদারল্যান্ড’ সিনেমাটি কুড়াচ্ছে দারুণ প্রশংসা। সবকিছু ঠিক থাকলে তিনি গড়তে পারেন অস্কারের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড।
আমরা কমবেশি সবাই সিনেমার সেই ‘অস্কার ক্লিপ’ বা সেরা দৃশ্যগুলো চিনে ফেলি। কোনো এক আবেগী দৃশ্য বা কান্নার বক্তৃতায় অভিনেতা যখন তার অভিনয়ের সবটুকু ঢেলে দেন, তখনই বোঝা যায় এটি অস্কারের মঞ্চে বারবার দেখানো হবে।
পাভল পাভলিকভস্কির নতুন সিনেমা ‘ফাদারল্যান্ড’ এ সান্দ্রা ঠিক তেমনই এক দৃশ্য উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। ১৯৪৯ সালের এক হোটেলে বসে পরিবারের সদস্যের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তার সেই শোক আর ভয়ের মিশ্র অভিব্যক্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন সবাই। সামনের অস্কারের আসরে এই দৃশ্যটি যে বারবার পর্দায় উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, সান্দ্রা এবার কেবল একটি নয়, বরং চারটি অস্কার ক্লিপের দাবিদার। জার্মানির এই গুণী অভিনেত্রী ‘অ্যানাটমি অব আ ফল’ দিয়ে আগেই নাম লিখিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এবার তিনি পা রেখেছেন হলিউডের বিশাল দুনিয়ায়।
একাডেমি তাদের নিয়মে কিছু বদল আনায় এখন থেকে একজন শিল্পী একই বিভাগে একাধিক মনোনয়ন পেতে পারেন। আর সেই সুযোগেই সান্দ্রা এবার সেরা অভিনেত্রী এবং সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী— উভয় বিভাগেই দুটি করে মোট চারটি মনোনয়ন পেয়ে ইতিহাস গড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
রায়ান গোসলিংয়ের সঙ্গে ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ সিনেমায় দাপুটে অভিনয়ের জন্য তিনি এখন পার্শ্ব অভিনেত্রীর দৌড়ে সবার আগে আছেন। বিশেষ করে হ্যারি স্টাইলসের গান গেয়ে সেই কারাওকে দৃশ্যে তিনি যা দেখিয়েছেন, তা সবাই মনে রাখবে অনেক দিন।
আগামী অক্টোবরে তাকে দেখা যাবে টম ক্রুজের সঙ্গে ‘ডিগার’ সিনেমায়। যদিও এই সিনেমা নিয়ে এখনই খুব বেশি কিছু জানা যায়নি, তবে পরিচালক ইনারিতুর আগের রেকর্ড বলছে এটি অস্কারের ঝুলিতে অনেক মনোনয়ন ভরবে। সেখান থেকে সান্দ্রার দ্বিতীয় পার্শ্ব অভিনেত্রীর মনোনয়ন আসা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
এদিকে ‘রোজ’ নামের একটি অস্ট্রিয়ান ড্রামায় ১৬০০ শতকের এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। সেখানে গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে তার সেই তেজস্বী বক্তৃতার দৃশ্যটি সরাসরি সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়নের দাবি রাখে।
দুটি সাদা-কালো ইউরোপীয় ঘরানার সিনেমা আর দুটি জাঁকজমকপূর্ণ হলিউড ব্লকবাস্টার এই চার সিনেমার জোরেই সান্দ্রা এখন আলোচনার তুঙ্গে। যদিও চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে এখনো কয়েক মাস বাকি, তবে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা এখন আর আকাশকুসুম নয়।
সান্দ্রার এই পথচলা কিন্তু খুব সহজ ছিল না। প্রায় ২০ বছর ধরে জার্মানিতে কাজ করার পর এখন তিনি পাচ্ছেন বিশ্বজোড়া খ্যাতি। হলিউডে একসময় ভাবা হতো চল্লিশোর্ধ্ব অভিনেত্রীদের বুঝি সুযোগ কম, কিন্তু ৪৮ বছর বয়সী সান্দ্রা প্রমাণ করেছেন প্রতিভা থাকলে বয়স কোনো বাধা নয়। রাতারাতি তারকা হওয়ার যে গল্প আমরা শুনি, সান্দ্রার ক্ষেত্রে সেই রাতটা ছিল দীর্ঘ ২০ বছরের।
২০১৬ সালে ‘টনি এরডম্যান’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথম বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিলেন তিনি। বুদ্ধিমত্তা, গম্ভীর চেহারা আর হুট করে ফেটে পড়া কষ্টের অভিব্যক্তি সব মিলিয়ে সান্দ্রা এক অনন্য নাম। সেই সময় তিনি হলিউডে যেতে কিছুটা ভয় পেতেন, ভাবতেন হয়তো নিজের রূপ বদলে সেখানে মানিয়ে নিতে হবে। ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি বলেছিলেন, তিনি নিজের রূপ বদলাতে চান না।
কিন্তু গত বছর ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’ এবং ‘অ্যানাটমি অব আ ফল’ সিনেমা দুটিতে তার অনবদ্য অভিনয় দুনিয়ার মানুষকে বাধ্য করেছে তার দিকে তাকাতে। এই সাফল্য দেখেই হলিউডের বাঘা বাঘা নায়ক রায়ান আর টম ক্রুজ তাকে তাদের পরবর্তী সিনেমায় নিয়েছেন।
এখন দেখার বিষয়, অস্কারের ভোটাররা সান্দ্রার এই অসামান্য প্রতিভাকে কতটা সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন।








