প্রতীক
বৃষ্টি যখন প্রকৃতির প্রতিশোধ

রশোমন। চলচ্চিত্রকার: আকিরা কুরোসাওয়া
রশোমন। ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়া জাপানি মাস্টার ফিল্মমেকার আকিরা কুরোসাওয়ার অনবদ্য সৃষ্টি। এশিয়ান চলচ্চিত্রকে পশ্চিমা তথা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সুপরিচিত করা প্রথম সৃষ্টিকর্ম হিসেবে বিখ্যাত।
জাপানের ঐতিহ্যবাহী রশোমন গেটে তুমুল বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়া একজন কাঠুরে ও একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে দিয়ে এর কাহিনি শুরু। সেখানে ভিক্ষুকে একটি নির্মম ঘটনার গল্প শোনায় কাঠুরে। জানায়, একদিন এক গহিন বনের ভেতর একজন সামুরাইয়ের স্ত্রীকে পাশবিক নির্যাতন করেছিল এক দস্যু; সে সময়ে খুন হয় ওই সামুরাই।
তার স্মৃতিচারণা থেকে ফ্ল্যাশব্যাকে ফিল্মটির কাহিনির বিস্তার ঘটে। দেখা যায়, স্থানীয় আদালত প্রাঙ্গণে ওই দস্যু ও নির্যাতিতাকে ধরে আনা হয়েছে। প্রথমে দস্যুটি, তারপর নির্যাতিতা এবং সবশেষে বিশেষ প্রেতচর্চার মাধ্যমে হাজির করানো সামুরাইয়ের আত্মা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেয়। কিন্তু ঘটনা অভিন্ন হলেও তিনজনের বিবরণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থেকে যায়, যা ধোঁয়াশা তৈরি করে।
সেই ধোঁয়াশার মধ্যেই ওই দীর্ঘ ফ্ল্যাশব্যাকের সমাপ্তি ঘটে। ততক্ষণে থেমে গেছে বৃষ্টি। কিন্তু রশোমন গেটে ভেসে আসে এক পরিত্যক্ত নবজাতকের কান্না। কাঠুরেটি ওই শিশুকে নিজের কোলে তুলে নেয়। বৃষ্টি শেষে মেঘ কেটে গিয়ে সূর্যের ঝলকানিতে সমাপ্তি নেমে আসে ‘রশোমন’-এর।
সারসংক্ষেপে মূল কাহিনি এ রকম হলেও চলচ্চিত্রটি জুড়ে রয়েছে বৃষ্টির প্রবল উপস্থিতি, যা ‘রশোমন’-এর প্রেক্ষাপটে দুর্দান্ত প্রতীকের ঘটিয়েছে প্রকাশ। কুরোসাওয়ার নানা চলচ্চিত্রেই বৃষ্টির হাজিরা থাকলেও এখানে এই উপাদানের ভূমিকা বিশেষভাবে অর্থবহ।
দুনিয়া জুড়ে মানুষের পাপাচার, হত্যা প্রবণতা, নিষ্ঠুরতা, যুদ্ধবাজির বিরুদ্ধে এ যেন প্রকৃতির এক রূঢ় প্রতিশোধ। প্রবল বর্ষণের মাধ্যমে স্বয়ং প্রকৃতিই যেন ধুয়ে-মুছে দিতে চাচ্ছে মানবসৃষ্ট সকল কলুষতা। তারপর যখন দেখেছে নতুন শিশুর আগমন, পৃথিবীতে জীবনকে নব উদ্যমে গড়ে তোলার আরেকটি সুযোগ দেওয়ার জন্যই হয়তোবা বৃষ্টি নিয়েছে বিরাম।
মেঘগুলো সরে গিয়ে আবারও দেখিয়েছে সূর্যের উদ্ভাস। ‘সেভেন সামুরাই’ (১৯৫৪), ‘ড্রিমস’সহ (১৯৯০) নিজের নানা চলচ্চিত্রে বৃষ্টির বিস্ময়বিমুগ্ধকর সব দৃশ্য সৃষ্টি করে যাওয়া কুরোসাওয়া বলতেন, ‘বৃষ্টি প্রতিটি আবেগকে তীব্র করে তোলে।’ ‘দৃশ্যগুলো চরম সীমায় নিয়ে যেতে’ একে ব্যবহারের পরামর্শ তিনি দিয়ে গেছেন। প্রতীকের আশ্রয় নিয়ে চলচ্চিত্রে সেই তীব্রতার ধ্রুপদি উদাহরণ হয়ে আছে তার ‘রশোমন’।




