উচ্চশিক্ষাকে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান অর্থমন্ত্রীর

উচ্চশিক্ষার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বক্তব্য রাখেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী- আগামীর সময়
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং নতুন বিভাগ ও বিষয় চালুর ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার খাত, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সুপারিশ না করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানকে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার সাভারের ব্র্যাক সিডিএমে ইউজিসির বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী উপাচার্যদের সংলাপের প্রথম দিনে উচ্চশিক্ষার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ অংশ নেন। এ সময় জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ইউজিসির সদস্য এবং উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থান নিয়ে উপাচার্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বললেন, দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চশিক্ষার বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে। শুধু সনদ অর্জন নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলাও উচ্চশিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, আগামী বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, এর কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার মান, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বর্তমান বাজারমুখী অর্থনীতিতে শিক্ষারও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের গবেষণা সক্ষমতা ও উদ্ভাবন সম্পর্কে শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনব্যবস্থা টেকসই হবে না।
তার মতে, দেশের শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অর্থায়ন এবং গবেষণার ফল বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারে এগিয়ে আসতে হবে। গবেষণা যেন শুধু প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এ জন্য শিক্ষাক্রমে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন বিষয়বস্তু যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উচ্চ মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী ছাড়া দেশের অগ্রগতি টেকসই হবে না।
তিনি আরও বলেন, বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর্থসামাজিক অবস্থা, লিঙ্গ বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বর্তমান সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী স্নাতক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহদী আমিনের মন্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ, প্রযুক্তি, ভাষা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা হওয়ার দক্ষতা বাড়াতে কর্মসংস্থানমুখী স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করা যেতে পারে।
তিনি শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ সৃষ্টি, মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার পরিসর বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা জোরদার এবং শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং তাদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বললেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। একদিকে নিয়োগদাতারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন জনবল পাচ্ছেন না, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ব্যবধান কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম, পাঠদানপদ্ধতি ও মূল্যায়নব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। উচ্চশিক্ষাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে হবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যানের মতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করে সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিতে না পারলে দেশের টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। উচ্চশিক্ষার টেকসই রূপান্তরের লক্ষ্যে ইউজিসি পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করছে। এর সফল বাস্তবায়ন হলে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
দুই দিনব্যাপী এ সংলাপে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যেরা উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, সুশাসন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, ডিজিটাল রূপান্তর, আন্তর্জাতিকীকরণ, শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন। প্রথম দিনে চারটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশনে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব, অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুনসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষাবিদেরা অংশ নেন।






