ঢাবিতে ১০৬ বছরেও রয়ে গেছে খাবার সমস্যা
- ক্যান্টিনে খেলেই পেট ব্যথা শুরু হয়, অভিযোগ শিক্ষার্থীদের
- ভর্তুকি দেয়ার কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ

সংগৃহীত ছবি
সাদাত হাসান। গত বছরের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলে সিট বরাদ্দ পান তিনি। হলে ওঠার পর বিভিন্ন হলের খাবার খেতে থাকেন। প্রথম ছয় মাসে শরীরে কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও কয়েকমাস ধরে হল ক্যান্টিনে খাবার খাওয়ার পর পেটের পীড়াজনিত নানা সমস্যায় ভুগছেন তিনি
‘খাবার খেলেই বমি, পেট ব্যথা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব হলেই খেয়েছি, একই সমস্যা দেখা দেয়। তবে বাড়িতে গিয়ে খাবার খেলে আবার এই সমস্যা হয় না’, মত সাদাতের।
বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থী শিহাব উদ্দিন সৈকতের তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিলো। সেই সঙ্গে ঘন ঘন প্রস্রাব। এরপর ডাক্তারের শরণাপন্ন হন তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার জানালেন, কিডনি জনিত সমস্যায় ভুগছেন। কিডনিতে দেখা যায় টেস্টিং সল্টের উপস্থিতি।
সৈকত জানালেন, হলের ক্যান্টিনের খাবার খেয়ে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে তার। অথচ হলে উঠার সময় সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন তিনি। ‘এই সমস্যা দুই সপ্তাহ আগে দেখা দিয়েছে। এরপর থেকে হলে এক বেলা খাই। মাঝে মাঝে ক্যাম্পাসের বাইরে খেতে যাই। কিন্তু সবসময় ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে খাওয়াটা আমার জন্য অনেক ব্যয়বহুল, ’ বলছিলেন সৈকত।
অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে সাদাত ও সৈকত জানালেন, কোনো ক্যান্টিনের খাবারের মান ভালো না। আবার না খাইলেই হয় না। দিনশেষে বুঝেশুনে অপুষ্টিকর খাবার খেতে হচ্ছে।
শুধু সাদাত ও সৈকতই নয়, এরকম আরো চার শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় আগামীর সময়ের। তারাও জানালেন, ক্যান্টিনের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে কমে গেছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের রোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রীদের মোট ১৮টি হলের ক্যান্টিনের খাবারের চিত্র এমনই। খাবারে অতিরিক্ত মশলার ব্যবহার, বাসি খাবার পরিবেশন, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাবার পরিবেশন না করা, তাজা শাক-সবজি, মাছ কিংবা মাংস রান্না না করাসহ নানা অভিযোগ করে আসছেন হলগুলোর শিক্ষার্থীরা।
যদিও ডাকসু নির্বাচনের পর হলগুলোর খাবারের মানের কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে তা আশানুরূপ নয়।
জুলাই আন্দোলনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যান্টিন মালিক পরিবর্তন হয়েছে চারবার। বর্তমানে যিনি আছেন তার বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ হলটির শিক্ষার্থীদের। মূলত মানসম্মত খাবার পরিবেশন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে এসব ক্যান্টিন মালিককে পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু তাতেও খাবারের মানে পরিবর্তন আসছে না বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।
জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলী আব্বাস মোহাম্মদ খোরশেদ বলেছেন, আমরা প্রায় প্রতিদিনই ক্যান্টিন পরিদর্শন করি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ক্যান্টিন মালিক যারা তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন না আসায়। আমি আবাসিক শিক্ষক থাকাকালীন এ পর্যন্ত চারবার ক্যান্টিন মালিক পরিবর্তন করা হয়েছে কিন্তু এরপরও যিনিই দায়িত্ব নেন তিনিই অস্বাস্থ্যকর উপায়ে খাবার পরিবেশনসহ নানা ধরনের কাজ করেন। এতে শিক্ষার্থীরাও বিরক্ত হয়ে যান।
আদর্শ খাবারের নানা দিক উল্লেখ করে এই পুষ্টিবিদ বললেন, ক্যান্টিনের খাবার স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিবেশন করা, বাসি খাবার পরিবেশন না করা, তাজা শাক-সবজি মাছ, কিংবা মাংসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রান্না করা হবে, এগুলোই আসলে সুস্বাস্থ্যের খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিষয়গুলো আমরা এখনো বাস্তবায়ন করতে পারছি না। যার ফলে, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
ভর্তুকি দেওয়ার চিন্তা
দীর্ঘদিনের খাবারের মানের সমস্যা সমাধানের কথা ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) জানালেন, ভর্তুকি দেওয়ার মাধ্যমে খাবারের মান কীভাবে আরও উন্নত করা যায় সেটি নিয়ে ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান যা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। শিক্ষার্থীরা যাতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় এইটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই। অতি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট ও প্রক্টরকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হবে।’




