এসএসসি থেকে এইচএসসি
দুই বছরে খাতা-কলম ছাড়লেন ৪৩% শিক্ষার্থী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সানজিদা আক্তার সুমনা। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ ছোবহানিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ২০২৪ সালে দাখিলে (এসএসসির সমমান) জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে পা রাখেন কলেজে। যথারীতি একাদশে ভর্তি হয়ে রেজিস্ট্রেশন করার পর বিয়ে দিয়ে দেয় পরিবার। থমকে যায় পড়াশোনার চাকা। দুই বছরের ব্যবধানে সহপাঠীরা আগামী ২ জুলাই পরীক্ষায় বসলেও দেখা যাবে না সুমনাকে। শুধু তিনিই নন, ৭ লাখ ২৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এসএসসি উত্তীর্ণ হয়েও বসতে পারছেন না আসন্ন পরীক্ষায়।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে একাদশে নিয়মিত হিসাবে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেছিলেন ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৮৭২ জন। কিন্তু দুই বছরের ব্যবধানে এইচএসসি পরীক্ষার চূড়ান্ত ফরম পূরণ করেছেন মাত্র ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ ছাত্রছাত্রী। অর্থাৎ এসএসসি পাসের পর শিক্ষার মূল স্রোতোধারা থেকে ছিটকে গেছে ৭ লাখ ২৪ হাজার ২১০ জন, যা মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ৪৩ দশমিক ৩১ শতাংশ।
‘চলতি বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৬ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। বাকি ৩ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৩ জনই অনিয়মিত, প্রাইভেট কিংবা এক বা একাধিক বিষয়ের মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থী’— বলছে বোর্ডে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের নথি।
সংখ্যায় ছাত্রী, হারে এগিয়ে ছাত্ররা: ঝরে পড়ার লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেছিলেন ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ ছাত্রী এবং ৮ লাখ ৬ হাজার ৫৫৩ ছাত্র। এর বিপরীতে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন ৫ লাখ ২ হাজার ৮৬৫ ছাত্রী এবং ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৮৫৭ ছাত্র। দুই বছরে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে গেছেন ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৫ ছাত্রী এবং ৩ লাখ ৬০ হাজার ১৯৬ ছাত্র। সংখ্যার বিচারে ছাত্রী ঝরে পড়ার সংখ্যা কিছুটা বেশি হলেও শতকরা হারের দিক থেকে ছাত্ররাই বেশি ঝরে পড়েছেন। ছাত্রদের ঝরে পড়ার হার যেখানে ৪৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের ৪১ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
এটিকে পুরোপুরি ঝরে পড়া হিসাবে দেখতে নারাজ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থীই যে ঝরে পড়েছেন, তা ঢালাওভাবে বলা যাবে না। কারণ ব্যক্তিগত বা অ্যাকাডেমিক কারণে এক বছর বিরতি (গ্যাপ) দিয়ে আগামী বছর পরীক্ষায় অংশ নেন অনেক শিক্ষার্থীই। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে এবং অনেকের বিদেশ চলে যাওয়ার প্রবণতাই ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ।
শিক্ষার্থী ছিটকে পড়ার প্রকৃত কারণ এবং এর স্থায়ী সমাধান খুঁজতে বড় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার আগামীর সময়কে বলেছেন, রেজিস্ট্রেশন করেও এত শিক্ষার্থী ঝরে যাওয়ার কারণ বের করতে গত বছর এসএসসির পর কয়েকটি উপজেলায় চলে পাইলট জরিপ। যে জরিপে বাল্যবিয়ে, ছেলেদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিতে কর্মসংস্থানে যুক্ত, বিদেশ চলে যাওয়া প্রধান কারণ হিসেবে বের হয়। বিশেষ করে, দেশের উত্তরাঞ্চল, শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন উপকূলীয় জেলাগুলোয় এ প্রবণতা অনেক বেশি।
বোর্ডভিত্তিক ঝরে পড়ার হার: তথ্যবিশ্লেষণে ঝরে পড়ার হারে শীর্ষে কুমিল্লা বোর্ড। এ বোর্ডে শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক ৪২ শতাংশ ঝরে গেছে। এরপরই যশোরে ৩৭ দশমিক ৫০ ও চট্টগ্রামে ৩৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ঝরে পড়ার হার ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ২৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, যার ঠিক ওপরেই রয়েছে রাজশাহী বোর্ড ৩০ দশমিক ২৫ শতাংশ। সাধারণ বোর্ডের তুলনায় মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ঝরে পড়ার হার আরও বেশি আশঙ্কাজনক।
মাদ্রাসা বোর্ড আলিমে নিবন্ধিত নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন; কিন্তু পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন ৭৮ হাজার ২৬৯ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ৬১ হাজার ৬৬০ ছাত্রছাত্রী আলিম পরীক্ষার মূল স্রোত থেকে ছিটকে গেছেন। কারিগরি বোর্ডে ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে ভয়াবহ। এখানে নিবন্ধিত ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেছেন মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন। অর্ধেকেরও বেশি— অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না ৯০ হাজার ৩৪৫ ছাত্রছাত্রী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মজিবুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, সরকার বাল্যবিয়ে বা বিদেশ যাওয়ার দোহাই দিয়ে মূলত সেই ব্যর্থতা আড়াল করতে চাচ্ছে। কারণ সরকারের ভাষ্য— বাল্যবিয়ে নেই এবং এ বয়সে বিদেশ যাওয়ার কথা নয়।
‘বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলেও আমাদের দেশে মাধ্যমিক স্তরটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। শিক্ষকসংকট থেকে শুরু করে এই স্তরে রয়েছে নানামুখী ঘাটতি ও উদাসীনতা। কোন স্তরে ঠিক কী কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছেন, তা নিখুঁতভাবে জানার জন্য এক দশক আগে ‘ইউনিক আইডি’ প্রকল্প নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি। ফলে প্রকৃত কারণ ট্র্যাক করা যাচ্ছে না এবং শিক্ষা প্রশাসন সবকিছু অনুমাননির্ভর তথ্য দিয়ে চালাচ্ছে।




