রাবির গবেষণা
ইন্টারনেটে পাতা বিষণ্ণতার জাল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গভীর রাত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর অনেক কক্ষে জ্বলছে আলো। কোথাও কানে হেডফোন গুঁজে শর্ট ভিডিও দেখছেন শিক্ষার্থীরা, কোথাও চলছে অনলাইন গেম। আবার কেউ টানা স্ক্রল করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রাত গড়িয়ে ভোর হলেও থামে না এই ভার্চুয়াল ব্যস্ততা। পরদিন সকালেই তার প্রভাব পড়ে ক্লাসরুমে, ঘুমঘুম চোখ, অন্যমনস্কতা, ক্লাস ফাঁকি আর মানসিক অবসাদে।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট আসক্ত শিক্ষার্থীদের ৭৩ শতাংশই ভুগছেন বিষণ্নতায়। গবেষকরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন ডিজিটালনির্ভরতা, রাতজাগা অভ্যাস এবং সীমিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মিলিয়ে ক্যাম্পাস জুড়ে তৈরি হচ্ছে নীরব মানসিক সংকট।
শুধু গবেষণার তথ্যই নয়; সরেজমিন অনুসন্ধানেও মিলেছে একই রকম চিত্র। গত কয়েক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ঘুরে দেখা যায়, গভীর রাত পর্যন্ত অনেক শিক্ষার্থী ব্যস্ত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কেউ অনলাইন গেমে, আবার কেউ সিরিজ কিংবা ভিডিও কনটেন্ট দেখতে দেখতে পার করছেন রাত। অনেক শিক্ষার্থীই স্বীকার করেছেন, এই অভ্যাস এখন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এভাবেই মোবাইল স্ক্রিনের আলোয় নিভছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সোনালি স্বপ্ন।
গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগের একদল গবেষক ‘Association of Depression with Internet Addiction among Students of a Public University in Bangladesh’ শীর্ষক গবেষণা পরিচালনা করেন। চলতি বছরের মার্চে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত হয় গবেষণাপত্রটি। গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের ১ হাজার ১৪ জন শিক্ষার্থীর ওপর চালানো হয় জরিপ।
এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভুগছেন ইন্টারনেট আসক্তিতে।
আর বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া গেছে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ইন্টারনেট আসক্ত শিক্ষার্থীদের ৭৩ শতাংশই (৭২ দশমিক ৮) ভুগছেন বিষণ্নতায়। আর আসক্ত নন এমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই হার ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ। গবেষণায় আরও দেখা যায়, ইন্টারনেট আসক্ত শিক্ষার্থীরা অন্যদের তুলনায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রায় পাঁচগুণ বেশি।
গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া প্রধান গবেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম মণ্ডল বললেন, ‘ইন্টারনেট আসক্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার বিদেশের অনেক গবেষণার তুলনায় বেশি। ভারতের চণ্ডীগড়ে যেখানে এই হার ছিল ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৩০ শতাংশ, সেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অনেক বেশি উদ্বেগজনক। এখানে ইন্টারনেট আসক্তদের ৭৩ শতাংশই ভুগছেন বিষণ্নতায়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পড়াশোনার প্রয়োজন ছাড়া প্রতিদিন ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত তারা অনলাইনে কাটান। অনেকেই রাতজেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাতে গিয়ে ঘুম, পড়াশোনা এমনকি সামাজিক সম্পর্কও হারাচ্ছেন ধীরে ধীরে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের এক শিক্ষার্থী বলেছেন, ‘শুরুতে এটা শুধু বিনোদন ছিল। এখন ফোন ছাড়া থাকতে পারি না। পরীক্ষার আগের রাতেও ফোন চেক করি কয়েক মিনিট পরপর। কখন রাত শেষ হয়ে যায় বুঝতেই পারি না।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বললেন, ‘রাত ২টা থেকে ৩টার আগে এখন আর ঘুমই আসে না। ফেসবুক, ইউটিউব, শর্ট ভিডিও দেখতে দেখতে চলে যায় সময়। সকালে ক্লাসে যেতে ইচ্ছা করে না। অনেক সময় সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গে মিশতেও বিরক্ত লাগে।’
বেগম খালেদা জিয়া হলের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবন দেখে নিজের ওপর তৈরি হয় এক ধরনের অদৃশ্য চাপ। সবসময় মনে হয় আরও ভালো করতে হবে আমাকে। পরিবার, পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ সবকিছুর চাপ তো আছেই, তার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনা। অনেক সময় খুব শূন্য লাগে, কিন্তু কথা বলার মতো কাউকে পাই না।’
রহমতুন্নেছা হলের চতুর্থ বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী বলেছেন, ‘অনলাইনে না থাকলে মনে হয় মিস করছি কিছু। পড়তে বসলে ফোন হাতে নিতে ইচ্ছা করে কয়েক মিনিট পরপর। ধীরে ধীরে এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।’
সরেজমিন কয়েকটি ছাত্র হল ঘুরে দেখা যায়, রাত গভীর হলেও অনেক কক্ষে শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে মোবাইলে ভিডিও দেখছেন বা গেম খেলছেন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিলেও পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। তাদের অনেকের মধ্যেই ক্লান্তি, অনিদ্রা ও মানসিক চাপের লক্ষণ দেখা গেছে।
শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তন স্পষ্টভাবে লক্ষ করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান রাজু বলেছেন, ‘মোবাইল-ইন্টারনেট মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় ক্লাসে ক্লান্ত, অমনোযোগী আর মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায়। ফলে তাদের চেহারায় অবসাদ ও বিষণ্নতার ছাপ ফুটে উঠছে।’
‘বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন বহুমুখী চাপের মধ্যে। একদিকে অ্যাকাডেমিক চাপ, অন্যদিকে বেকারত্বের ভয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, এর সঙ্গে অতিরিক্ত ডিজিটালনির্ভরতা যোগ হয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলছে’— জানালেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. এনামুল হক। ‘প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে আসেন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সেবার পরিধি এখনো সীমিত’, যোগ করেন তিনি।
গবেষক অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম মণ্ডল বললেন, ‘সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং প্রতিরোধমূলক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সংকটের দিকে যাচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার মনোসেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়।’
গবেষকরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতামূলক প্রচার, সহজলভ্য ও গোপনীয় কাউন্সেলিং সেবা এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা কার্যক্রম বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে বৃহৎ পরিসরে গবেষণারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।




