অভ্যুত্থান-পরবর্তী ঢাবি
গবেষণা ও শিক্ষায় ফিরছে আলোর রেখা

সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় শুধু দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না; দলীয় ছাত্ররাজনীতি, গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত, শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, গবেষণায় স্থবিরতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও সমানভাবে আলোচিত হয়েছে। এসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি, বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আগ্রহও ছিল সীমিত।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। ক্যাম্পাসে দখলদারিত্বের রাজনীতির প্রভাব কমেছে, আবাসিক হলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ফিরেছে, বিলুপ্ত হয়েছে বহু বছরের গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি। দীর্ঘদিন পর শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক স্বাধীন পরিবেশে ক্লাস, গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও শিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিকীকরণকে কেন্দ্র করে একাধিক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়েও।
সম্প্রতি প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) ইমপ্যাক্ট র্যাঙ্কিং ২০২৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৬০০ ধাপ এগিয়ে ১০০১-১৫০০ ব্যান্ড থেকে ৪০১-৬০০ ব্যান্ডে উঠে এসেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, নীতিনির্ধারণ ও সামাজিক সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে বিশ্বের ১১৬টি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৬৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নের মাধ্যমে এই র্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয়। বিশেষভাবে ‘পিস, জাস্টিস অ্যান্ড স্ট্রং ইনস্টিটিউশনস’ (এসডিজি-১৬) সূচকে বিশ্বের ২৪তম স্থান অর্জন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন ইমপ্যাক্ট র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অগ্রগতি আমাদের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশেষ করে এসডিজি-১৬ সূচকে বিশ্বের ২৪তম স্থান অর্জন আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে সাম্প্রতিক সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
শুধু টাইমস হায়ার এডুকেশন নয়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৭-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টানা তৃতীয়বার বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় জায়গা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং-এ এশিয়ার ১ হাজার ৫২৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩২তম স্থান অর্জন করেছে। দুই র্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এছাড়া ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এলসেভিয়ার প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষক ও গবেষক স্থান পেয়েছেন, যা বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
উপাচার্যের ভাষায়, এসব অর্জন শুধু আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের উন্নতি নয়; বরং গবেষণার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষেরও প্রতিফলন।
গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন গবেষণাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতোমধ্যে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে যৌথ গবেষণার আলোচনা হয়েছে। চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়-এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি ও গবেষণা সহযোগিতা নিয়ে চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে। এ ছাড়া কুইন্স মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এবং ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বহুদেশীয় গবেষণা কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে আরও উন্নতির লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পৃথক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। অনুষদ, বিভাগ ও ইনস্টিটিউট পর্যায়ে গবেষণার তথ্য সংরক্ষণ, ডকুমেন্টেশন, ওয়েবসাইট হালনাগাদ এবং গবেষণা প্রকাশনা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি 'ইউনিভার্সিটি ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং' শীর্ষক সমন্বয় সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেছেন, শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যুগোপযোগী কারিকুলাম এবং বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। শিক্ষা, গবেষণা, আবাসন ও প্রশাসনিক সংস্কারে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।’




