ইআরবি
ভিসির ‘পকেটের লোক’ বসাতে তোড়জোড়
- ইউজিসির নিষেধাজ্ঞার মধ্যে লিয়েনে নিয়োগের তৎপরতা
- গোপনে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ ৫ পদে অফার লেটার
- নেপথ্যে কোটি টাকার লেনদেন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
নিয়োগে অনিয়মসহ নানা কেলেঙ্কারিতে আলোচিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (ইআরবি) ফের এসেছে আলোচনায়। এবারের অভিযোগের তীর বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আবু জাফর খানের দিকে। জানা গেল, নিজের পছন্দের মানুষ নিয়োগ দিতে তিনি গোপনে শুরু করেছেন তোড়জোড়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, পরিদর্শকসহ পাঁচটি পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়েছেন অফার লেটারও। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে কোটি টাকার লেনদেন, সঙ্গে প্রশাসনিক পদগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা; বলছে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সূত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়োগ নিয়ে নানা কেলেঙ্কারির কারণে সব ধরনের নিয়োগ বন্ধ রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। চলমান রয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিও। এসব সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়েই ইআরবির শীর্ষ পাঁচ পদে চলছে নিয়োগের প্রক্রিয়া, যা উপাচার্য আর রেজিস্ট্রার ছাড়া জানেন না কেউ।
বেশ কয়েকটি সূত্রের কাছ থেকে আগামীর সময় জানতে পেরেছে, এই পদগুলো হলো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অর্থ বিভাগের পরিচালক, মাদ্রাসা পরিদর্শক এবং দুজন ডিন। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয় এই গোপন নিয়োগ কার্যক্রম। এরই মধ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এমদাদুল হক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. ইদ্রিস আলী ও আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. গোলাম রব্বানী লিয়েনে ডিন নিয়োগের অফার লেটার পেয়েছেন। অফার লেটার পাওয়ার পর তাদের মধ্যে কেউ কেউ লিয়েনে ছুটির আবেদনও করে ফেলেছেন।
নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এমদাদুল হক ইআরবির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে অফার লেটার পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, এক বছরের লিয়েন ছুটির জন্য তিনি নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। আর নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. হারুন অর রশিদও ছুটির আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করলেন।
এ ছাড়া কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গোলাম রব্বানীও অফার লেটার পাওয়া এবং ছুটির আবেদন করার কথা জানালেন। তাদের মধ্যে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি প্রফেসর ইদ্রিস আলীকে, যাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে অর্থ বিভাগের পরিচালক পদে।
তৃতীয় গ্রেডের এসব পদে লিয়েন (অন্য কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে আসা) বা প্রেষণে নিয়োগের বিধান রয়েছে। তবে অতীতে ভিসিরা লিয়নে নিয়োগ দিতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। এতে নিজেদের পছন্দের ‘পকেটের লোক’ বসানো সহজ হতো। আর এর রেশ ধরেই ঘটত নিয়োগ নিয়ে নানা কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ঘটনা। এমন পরিস্থিতির কারণে ২০২৪ সালে ইউজিসি ইআরবির আর্থিক ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে আলাদা পরিপত্র জারি করে।
পরিপত্রের ১৩ ধারায় বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেষণের ক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশের মাধ্যমে পদায়ণ ও যোগদান সম্পূর্ণ করতে হবে। ইউজিসি আর্থিক বিধিমালায় ৪ নম্বর ধারায় বলেছে, লিয়নে রেজিস্ট্রার, অর্থ পরিচালক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এসব পদে লিয়নে আর কোনো নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
ইউজিসির এমন কড়া নির্দেশনার পর ২০২৪ সালে সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হয়, লিয়নের পরিবর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডার বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রেষণে যোগ্য কর্মকর্তা পদায়ন করা হবে। তৎকালীন রেজিস্ট্রার ড. রেজাউল হকই হবে লিয়েনের শেষ নিয়োগ।
সবশেষ নিয়োগে রেজিস্ট্রার তার তার ছেলেকে অবৈধভাবে নিয়োগ দিতে নানা জালিয়াতির আশ্রয় নেন। অন্য পদগুলোতেও অর্থ লেনদেনের ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এরপর সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার। ইউজিসির নিয়োগে তদন্তে গঠন করে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি, যেই কমিটি এখনও প্রতিবেদন দেয়নি। এর মধ্যেই উপাচার্য আবারও পছন্দের লোকদের লিয়নে নিয়োগের তোড়জোড় শুরু করেছেন।
অবশ্য উপাচার্য প্রফেসর ড. আবু জাফর খান আগামীর সময়কে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বললেন, ‘বিষয়টি আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম।’
এরপর ইউজিসি ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অমান্য করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করলে তিনি মিটিংয়ে আছেন, পরে কথা বলবেন বলে মোবাইল সংযোগ কেটে দেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একজন কর্মকর্তা জানালেন, লিয়েনে বা প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চাপ থাকলেও ইআরবি নানা টালবাহানা করে আসছিল। সম্প্রতি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগে ২২তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা নওসের আলীকে পরিচালক হিসেবে প্রেষণে পদায়ন করা হলে প্রথমে তার যোগদানের ক্ষেত্রে নানা বাধা সৃষ্টি করা হয়। যদিও মন্ত্রণালয়ের চাপে যোগদান করাতে বাধ্য হয়। উপাচার্যের শঙ্কা, পরিদর্শক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ অন্যান্য পদে মন্ত্রণালয় তার পছন্দের বাইরে কাউকে হয়তো নিয়োগ দিয়ে দেবে। আর তাই নিজেই সব নিয়ম ভেঙে তড়িঘড়ি করে নিয়োগের কাজ সারতে শুরু করেছেন।
সারা দেশে আলিম ও ফাজিল পর্যায়ে ১ হাজার ৭০০ মাদ্রাসা তদারকি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ ছাড়া ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে অনুমোদন, পরিদর্শন, পরীক্ষা নেওয়া, কমিটি অনুমোদনের কাজও করে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেন অধিকাংশ কর্মকর্তা। অভিযোগে প্রমাণ হওয়ায় অনেক কর্মকর্তার চাকরিও হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।







