সময় ফুরিয়ে খুলছে জাহাজ কেনার জট
- ১৫ বিলিয়ন ডলারের সমুদ্রবাণিজ্যে বিএসসির বহরে মাত্র ৭ জাহাজ
- নতুন ৭ জাহাজের পথেও অনুমোদন-ঋণ-নির্মাণের দীর্ঘসূত্রতা

সমুদ্রের বুক চিরে জাহাজ এগিয়ে যায়, আর তার সঙ্গে এগোয় দেশের বাণিজ্য। কিন্তু সেই বাণিজ্যের বিশাল সমুদ্রে বাংলাদেশের নিজের পতাকা ওড়া জাহাজের সংখ্যা এখনো বড়ই কম। দেশের বন্দরে পণ্য আসে, যায়; বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার ভাড়া গোনে বিদেশি জাহাজ। অথচ যে দেশের সমুদ্রবন্দর আছে, নিজস্ব জাহাজ আছে, সেই দেশের রাষ্ট্রীয় জাহাজ কোম্পানি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) বহর মাত্র সাতটি। আর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট জাহাজ রয়েছে ১০৮টি।
হিসাব বলছে, বছরে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভাড়া গুনতে হয়। এর বিপরীতে দেশি জাহাজগুলো থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসে মাত্র প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বা ২৫ হাজার কোটি টাকা। মানে এই বিশাল বাজারের প্রায় ৮৭ শতাংশই বিদেশি মালিকানাধীন জাহাজের দখলে। সংখ্যার এই বৈপরীত্যই বলে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে। অন্যদিকে এই বিশাল বাজারের সামান্য অংশ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে বিএসসিকে।
তবে বিএসসির বহর বাড়ানোর চেষ্টা অবশ্য থেমে নেই। নিজস্ব অর্থায়ন, সরকারি অর্থ এবং বিদেশি ঋণ—তিন পথেই চলছে জাহাজ কেনার উদ্যোগ। কিন্তু সেই উদ্যোগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে না বাস্তবায়নের গতি। চীনের ঋণে চারটি জাহাজ কেনার উদ্যোগে অবশেষে জট খুলেছে। ঋণচুক্তিও হয়েছে। কিন্তু জাহাজ হাতে পেতে এখনো অন্তত তিন বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারি অর্থায়নে দুটি এবং বিএসসির নিজস্ব অর্থায়নে আরও একটি জাহাজ কেনার উদ্যোগও আটকে আছে প্রকল্প অনুমোদন ও ডিপিপি পুনর্গঠনের ধাপে। ফলে বহরে নতুন করে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাতটি জাহাজের কোনোটি এখনই সমুদ্রে নামছে না।
ঋণের জট খুলেছে, জাহাজ আসতে দেরি: চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণে চারটি জাহাজ কেনার প্রকল্পটি ছিল বহুদিনের। দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার এবং দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার কেনার জন্য ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল একনেকে ডিপিপি অনুমোদন পায়। একই বছরের ২০ জুলাই সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ১৪ অক্টোবর ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিও হয়। তারপরই আটকে যায় সবকিছু— ঋণ না পাওয়ায়।
এর মধ্যে সরকারও বদলেছে। শুরু থেকে আবার এগোতে হয়েছে প্রকল্পটিকে। ঋণের শর্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে তৈরি হয় জটিলতা। শুরুতে চীনের পক্ষ থেকে শর্ত ছিল, প্রকল্পে দুর্নীতি হলে তার বিচার হবে চীনের আদালতে। বাংলাদেশ সেই শর্ত মেনে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য নতুন ঋণচুক্তিতে ওই শর্ত রাখা হয়নি।
গত ১১ মার্চ চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ৯ জুলাই অর্থ বিভাগের সঙ্গে বিএসসির হয়েছে সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ)। চুক্তি অনুযায়ী চীনের এক্সিম ব্যাংক দেবে ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। এই ঋণ সরকার নেবে ২ শতাংশ সুদে। সেই টাকা বিএসসিকে দেওয়া হবে ৫ শতাংশ সুদে। চার জাহাজ কিনতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার। জাহাজ নির্মাণ করবে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি)।
কিন্তু চুক্তি হলেই তো জাহাজ হাতে আসছে না। স্টিল কাটিং থেকে নির্মাণ শেষ করতেই লাগবে অন্তত আড়াই বছর। এরপর জাহাজ জলে নামবে, শুরু হবে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ আরও প্রায় তিন বছর বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ঋণের জট খুললেও সমুদ্রযাত্রার জট খুলতে এখনো বাকি।
সরকারি টাকায় দুই, নিজের টাকায় এক: বিএসসি বহর বাড়াতে সরকারি অর্থায়নে ৪০ থেকে ৫৫ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার দুটি মিডিয়াম-রেঞ্জ অয়েল ট্যাংকার কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। গত ২ এপ্রিল প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভা হয়েছে। সভার নির্দেশনায় নতুন করে ডিপিপি পুনর্গঠন করে গত ১২ মে তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এখন একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষা।
একইভাবে বিএসসির নিজস্ব অর্থায়নে ৫৫ থেকে ৬৬ হাজার ডেডওয়েট টনের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার কেনার উদ্যোগও এগোচ্ছে ধীরগতিতে। গত ১৫ জুন প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় ডিপিপি নতুন করে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সেই কাজ এখনো ৫০ শতাংশের মতো শেষ হয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে নতুন জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর বেশিরভাগ এখনো নির্মাণ শুরুর আগের ধাপেই।
নতুন করে বিএসসির বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাতটি জাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া কোনটার অবস্থা কতদূর— এমন প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ডিপিপিগুলো ভৌত অবকাঠামো বিভাগে যাবে। সেখান থেকে একনেকে ওঠার পর ডিপিপি পাস হলে বাকি কাজ শুরু হবে। তবে ভৌত অবকাঠামো বিভাগে কবে যাবে, তা না জানা পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না।’
৫৩ বছরে সাত জাহাজ— কেন এই দশা?: ১৯৭৩ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল বিএসসির। শুরুতে বহরে ছিল মাত্র দুটি জাহাজ। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও ৪৪টি জাহাজ যুক্ত হয়। কিন্তু আয়ুষ্কাল শেষ হতে থাকায় নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ৩৬টি জাহাজ বহর থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
একসময় সংখ্যা আবার নেমে আসে দুইয়ে। ২০১৮ সালে চীন থেকে ছয়টি জাহাজ কেনার পর বহর দাঁড়ায় আটটিতে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইউক্রেনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ‘বাংলার সমৃদ্ধি’। গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ‘এমটি বাংলার জ্যোতি’ ও ‘এমটি বাংলার সৌরভ’। পরে দুটি জাহাজই স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে।
সবশেষ গত ১০ মাসে নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার কেনা হয়েছে। ৬৩ হাজার ৫০০ ডেডওয়েট টনের এমভি বাংলার প্রগতি বহরে যুক্ত হয় ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর। একই ধারণক্ষমতার এমভি বাংলার নবযাত্রা যুক্ত হয় ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি। চীনে নির্মিত জাহাজ দুটির দাম প্রায় ৬৯০ কোটি টাকা। বিএসসির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরো অর্থ দিয়েছে সংস্থাটি নিজস্ব তহবিল থেকে। এই দুটি জাহাজই এখন বিএসসির ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
নিজের টাকায় গতি, ঋণে দীর্ঘসূত্রতা: বিএসসি কেন পিছিয়ে— তার উত্তরও দিয়েছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক। তার বক্তব্য, ঋণ বা সরকারি অর্থে জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া দীর্ঘ। নিজস্ব অর্থে জাহাজ কিনতে পারলে কাজ দ্রুত করা সম্ভব। দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা বিএসসি গত দুই অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা লাভ করেছে। এই সময়ে নিজস্ব অর্থায়নে দুটি জাহাজও কেনা হয়েছে। অর্থাৎ সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতাই বড় বাধা।
দেশি জাহাজে ৫৬ লাখ টন, বিদেশিদের হাতে ৮৭% বাজার: বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন বাল্ক, কনটেইনার ও গ্যাস-তেল ট্যাংকার মিলিয়ে জাহাজগুলো একসঙ্গে প্রায় ৫৬ লাখ টন পণ্য বহন করতে পারে। দেশি জাহাজে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে।
কিন্তু সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের মোট ব্যয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দেশের জাহাজ মালিকরা যে বাজারের সামান্য অংশ ধরে রেখেছে, তার কয়েক গুণ বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশি জাহাজ কোম্পানির কাছে। বেসরকারি খাত ধীরে ধীরে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিএসসি এখনো সেই দৌড়ে অনেক পেছনে।
সমুদ্র আছে, বাজার আছে— গতি নেই: বিএসসির সামনে এখন সুযোগও আছে, প্রয়োজনও আছে। গত দুই অর্থবছরের মুনাফা, নিজস্ব অর্থায়নে দুটি জাহাজ কেনার সক্ষমতা এবং নতুন সাত জাহাজের উদ্যোগ— সবই ইতিবাচক সংকেত।
কিন্তু ১৫ বিলিয়ন ডলারের বাজারে রাষ্ট্রীয় বহরের আকার যদি মাত্র সাতটি জাহাজেই আটকে থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়— বাংলাদেশের সমুদ্রবাণিজ্যের এত বড় অংশ কেন অন্য দেশের জাহাজে বহন হবে?
চীনের ঋণের জট খুলেছে। সরকারি অর্থের প্রকল্প একনেকের দরজায়। নিজস্ব অর্থের জাহাজের ডিপিপি পুনর্গঠনের পথে। কিন্তু জাহাজগুলো এখনো সমুদ্রে নয়, কাগজের পাতায়।
সমুদ্রের বাণিজ্য যত দ্রুত এগোয়, বিএসসির জাহাজ কেনার গতি ততটাই ধীর। আর এই ধীরগতির খেসারত দিতে হচ্ছে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশি জাহাজের ভাড়ায়।
সমুদ্রের বুকে বাংলাদেশের পতাকা ওড়া জাহাজ আরও বেশি দেখতে চায় দেশ। কিন্তু সেই স্বপ্নের তীরে পৌঁছাতে বিএসসিকে এখনো পাড়ি দিতে হচ্ছে দীর্ঘ এক প্রশাসনিক সমুদ্র।




