কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান বাধা বৈরী ব্যবসায়িক পরিবেশ, সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের

সোমবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ব ব্যাংকের যৌথ আয়োজনে এক সেমিনারে কথা বলছেন সিনিয়র অর্থনীতিবীদ ড. ধরুভ শর্মা। ছবি: সংগৃহীত
দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা যাচ্ছে না। আর এর পেছনে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে দেশের বৈরী ও জটিল ব্যবসায়িক পরিবেশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যবসায়িক পরিবেশের আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
প্রতিবেদনের ‘বিশেষ ফোকাস’ অংশে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান ৪টি সংকট ও তা থেকে উত্তরণের উপায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
সোমবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ব ব্যাংকের যৌথ আয়োজনে সেমিনারে এ তথ্য জানান বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবীদ ড. ধরুভ শর্মা ।
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে বা ট্রেড লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের মতো সরকারি অনুমোদন পেতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি সময় এবং অর্থ অপচয় হয়। বড় কোম্পানিগুলো এই ধাক্কা সামলাতে পারলেও, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SMEs) বিভিন্ন দপ্তরের হয়রানি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খরচের চাপে পিষ্ট হচ্ছে।
দেশের শিল্পাঞ্চল ও কারখানাগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটকে বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পাওয়ায় কল-কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরা যেমন নতুন বিনিয়োগে ভয় পাচ্ছেন, তেমনি বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
দেশের বাজারে সুস্থ ও সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নেই। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে একচেটিয়া বা অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে। এই বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে নতুন, উদ্ভাবনী ও দক্ষ বেসরকারি কোম্পানিগুলো বাজারে টিকতে পারছে না।
চট্টগ্রাম বন্দরসহ প্রধান বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময় লাগা এবং কাস্টমসের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে আমদানি-রপ্তানি খরচ অনেক বেশি। পাশাপাশি বর্তমান ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে যে কড়াকড়ি রয়েছে, তা রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাওয়াচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ: কর্মসংস্থান বাড়াতে করণীয়
ব্যবসায়িক পরিবেশকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান-বান্ধব করতে বিশ্বব্যাংক মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে:
১. স্মার্ট ডিরেগুলেশন: ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার সমস্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ও প্রাচীন নিয়মকানুন বাতিল করে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তাদের সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে না হয়।
২. সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা: বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেন অতিরিক্ত সুবিধা না পায়, তা তদারকি করতে ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’কে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে।
৩. অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ: বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়িয়ে ব্যবসার খরচ (Cost of Doing Business) কমাতে হবে। একই সাথে, শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, কেবল প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে যদি এই কাঠামোগত সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই বেসরকারি খাতের হাত ধরে তরুণদের জন্য কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে।




