সরকারি ঋণে নীরব বিপ্লব
- বদলে যাচ্ছে অর্থায়নের কৌশল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় ঋণ-ট্রেজারি বন্ডভিত্তিক অর্থায়নের দিকে ঝুঁকছে সরকার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের চাপ এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে ঋণ ব্যবস্থাপনায় এ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। গত চার বছরে ট্রেজারি বন্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আর বিদেশি ঋণগ্রহণের গতি তুলনামূলকভাবে শ্লথ। অর্থ বিভাগের ঋণ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এ চিত্র।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানালেন, সরকারের ঋণ নেওয়ার ধরন বদলে যাচ্ছে। একসময় বাজেট অর্থায়নে বিদেশি ঋণের ওপর যে নির্ভরতা ছিল, এখন সে জায়গা দখল করছে দেশীয় ঋণ, বিশেষ করে ট্রেজারি বন্ড। এটি সরকারের অর্থায়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এ কৌশলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও সুদ ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেছেন, দেশীয় ঋণের বড় অংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া হলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি দেশীয় ঋণের সুদের হার বিদেশি ঋণের তুলনায় বেশি হওয়ায় সরকারের সুদব্যয়ও বাড়তে পারে। তার মতে, এ কৌশল তখনই সফল হবে, যখন সরকার একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারবে, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
সরকারের ঋণ কৌশলে বড় পরিবর্তন: ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণ ১৩ দশমিক ৪৫ লাখ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৫৯ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধির ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার দেশীয় উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ট্রেজারি বন্ড ও এসপিটিবির মাধ্যমে ঋণ ৩ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ২৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এদিকে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণও ৪ দশমিক ২১ লাখ কোটি থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৮২ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে বিদেশি ঋণ ৪ দশমিক ৯৬ লাখ কোটি থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৬৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছালেও এর প্রবৃদ্ধি দেশীয় ঋণের তুলনায় কম। বিশ্বব্যাংক আইডিএ, এডিবি ও জাপান এখনো প্রধান ঋণদাতা হলেও নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ঋণ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থায়নের এই পরিবর্তিত কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারকে আরও গভীর এবং কার্যকর করা, ঋণের গড় মেয়াদ বৃদ্ধি এবং স্বল্পমেয়াদি, তুলনামূলক ব্যয়বহুল অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমানো।
সেখানে আরও বলা হয়, সরকারি সিকিউরিটিজভিত্তিক দেশীয় ঋণের অংশ বাড়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ঝুঁকিও কমবে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ডলারের চাপের মধ্যে এ কৌশল সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে এটি দেশীয় বন্ড বাজারের গভীরতা বাড়িয়ে ভবিষ্যতে সরকারের অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও পরিকল্পিত ও পূর্বানুমানযোগ্য করার পথ তৈরি করবে।
অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের সরকারের ঋণগ্রহণের পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে বাজেট ঘাটতি মেটাতে মোট ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এটি সংশোধিত বাজেটে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণগ্রহণ ১৩ শতাংশ বেড়েছে। ওই সময়ে ঋণগ্রহণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
দেশীয় ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে ট্রেজারি বন্ড ও সুকুক থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিসংখ্যানে। এ দুই মাধ্যমে সরকার ৭০ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলে নতুন ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে ৪৬ কোটি টাকা নিট পরিশোধ করা হয়েছে। একইভাবে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ২ হাজার ৬৯০ কোটি এবং সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (জিপিএফ) থেকে ৩ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা নিট পরিশোধ হওয়ায় অ-বাজারভিত্তিক ঋণ ঋণাত্মক ৬ হাজার ১৩৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জুলাই-মার্চ সময়ে বিদেশি ঋণ এসেছে ১৪ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক অর্থায়ন ৫৩ শতাংশ কমেছে। ফলে অর্থের চাহিদা পূরণে সরকারকে দেশীয় বাজার, বিশেষ করে ট্রেজারি বন্ড ও অন্যান্য বাজারজাতযোগ্য সরকারি সিকিউরিটিজের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে।
এদিকে ট্রেজারি বন্ড থেকে ঋণ বেশি নেওয়ার কারণে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক তাদের মূলধনের বড় অংশ বিনিয়োগ করছে এ খাতে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শেয়ারবাজারের ৮৬ শতাংশ ব্যাংকের এ প্রবণতা স্পষ্ট, যেখানে মূল ব্যবসার চেয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ট্রেজারি বন্ড, প্রাইজ বন্ড ও বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়ে উঠছে প্রধান চালিকা শক্তি।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বন্ড ছাড়াও বিদেশি ঋণের বিকল্প উৎস হিসেবে সরকার পদ্মাসেতুসহ দেশের বড় বড় অবকাঠামোর বিপরীতে সুকুক বন্ড ইস্যু করতে যাচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরকার বন্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে ভবিষ্যৎ অর্থায়নে সরকার ঋণের বিকল্প হিসেবে বন্ডের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এতে ব্যাংক খাতেও পর্যায়ক্রমে চাপ কমে আসবে।






