যুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আইএমএফের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আগামী জুনে আইএমএফের ঋণের কিস্তি ছাড় চাওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকায় সফররত আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের বৈঠকে এসব সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। আর এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক ঋণের কিস্তি নিয়ে আলোচনা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা দেশের অর্থনীতিকে খারাপ অবস্থায় পেয়েছি। সেখান থেকে উত্তরণে প্রভূত সংস্কার দরকার। এরসঙ্গে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারে চ্যালেঞ্জ আছে, কর-জিডিপি অনুপাত একেবারে নিম্ন পর্যায়ে। এটাতে উন্নতির জন্য আমরা কী করতে পারি, সে বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন। নতুন সরকারের সঙ্গে ঋণ নিয়ে দাতা সংস্থাটি এটি প্রথম বৈঠক।
‘সব একসঙ্গে করা যাবে না, আমরা বরং আমাদের মতো করে করব। যেসব শর্ত আছে, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে’, ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিপরীতে আইএমএফের শর্ত প্রসঙ্গে বলছিলেন অর্থমন্ত্রী।
একই সময়ে কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, বাংলাদেশ নতুন করে কোনো ঋণের অনুরোধ করেছে কি না? জবাবে তিনি সরাসরি কিছু না বললেও এক ধরনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, অর্থায়ন ও নীতিগত আলোচনা একসঙ্গেই এগিয়ে চলছে।
‘যে কোনো অর্থায়ন সংক্রান্ত আলোচনা সব সময়ই নীতিগত আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া চলমান’, যোগ করেন কৃষ্ণা।
আগামী এপ্রিলে ওয়াশিংটনে শুরু হচ্ছে আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক। এই বৈঠক শেষে আইএমএফের একটি মিশন পুনরায় ঢাকায় আসবে। সেই মিশনের প্রতিবেদন আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদে পেশ করা হবে। আগামী জুনে পর্ষদ বৈঠক আছে; পরের মাস জুলাইয়েও আছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সফররত আইএমএফের দলের কাছে জুনের পর্ষদ বৈঠকে কিস্তি ছাড়ের প্রস্তাব উত্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়।
আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি সংকট পরস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও পরিবহনে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের সময় সবাই বাড়িতে যেতে পেরেছে, ভাড়া বাড়েনি, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল।’
‘তবে উন্নয়ন প্রকল্প থমকে গেছে। অন্তবর্তী সরকারের সময় থেকেই উন্নয়ন প্রকল্পের এই অবস্থা। আমরা এগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করব। আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে’, সংকটের ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করেন আমির খসরু মাহমুদ।
ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সবাইকে সংযমী হওয়ার আহবান জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, গার্মেন্টখাতে প্রতি বছর ঈদের আগে যে সমস্যাগুলো হয়, এবার তেমন কোনো অস্থিরতা ছিল না। কারণ এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফল। আমরা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে রমজানজুড়ে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সরকার একা পারবে না। আমরা দেশবাসীর কাছে আবেদন করব সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে, সহানুভূতিশীল হতে হবে, সংযম আমাদের মধ্যে আনতে হবে।
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে নীতিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
‘চলমান যুদ্ধ বিশ্বের সব দেশে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এর ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নেই। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফ নিবিড়ভাবে কাজ করছে’, বৈঠকের আলাপ নিয়ে ব্যাখ্যা করেন কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন।

