কর-ছাড়ে বদলে গেল বাজেটের দর্শন
- অর্থনীতিকে বেসরকারি খাতনির্ভর করতেই শেষ সময়ে আমূল পরিবর্তন
- কর-সুবিধা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান হাতিয়ার করা হয়েছে
- জনমতের ভিত্তিতে বিতর্কিত কয়েকটি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার
- পুঁজিবাজারকে বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার স্পষ্ট কৌশল
- ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির নতুন খাত হিসেবে চিহ্নিত
- এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট, সাফল্যনির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর : এম কে মুজেরী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অর্থনীতিকে বেসরকারি খাতনির্ভর করতেই শেষ সময়ে আমূল পরিবর্তন এনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাস করছে সরকার। যে কারণে ব্যাপকভাবে কর-ছাড় ও শুল্ক সুবিধা দিয়েছে শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রিক যানবাহন, পুঁজিবাজার ও ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এসব ছাড় ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল বুধবার (১ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া চলতি বাজেট গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এর আগে গত ১১ জুন এ বাজেট ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুরুতে বিভিন্ন খাতে ছাড় ও সুবিধার কথা থাকলেও শেষ সময়ে সেটি বাড়িয়ে বিভিন্ন ছাড় ও সুবিধা দিয়ে ৬৪টি পরিবর্তন আনা হয় অর্থবিলে। এত বেশি পরিবর্তন এনে বাজেট পাসের নজির খুবই কম বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ মহল ও সংশ্লিষ্টরা।
বিগত এক দশকের বাজেটগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভ্যাট ও করের বিস্তার, অবকাঠামো ব্যয়ে জোর। কিন্তু এই বাজেটে সরকার উল্টোপথে হেঁটেছে। শিল্প, প্রযুক্তি, পুঁজিবাজার, ডিজিটাল খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে একের পর এক কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদীয় আলোচনার পর জনমতের ভিত্তিতে কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। নতুন বাজেটে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, মধ্যবিত্ত, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের কাছে একটি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সেটি হচ্ছে রাষ্ট্র প্রবৃদ্ধির চালক হবে না, বরং প্রবৃদ্ধির জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে।
অর্থনীতিতে একটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো— সরকার সবসময় বেশি কর নিয়ে ধনী হয় না, বরং কখনো কখনো কম কর আরোপ করে অর্থনীতিকে সচল করলে দীর্ঘ মেয়াদে রাজস্বও বাড়ে। সেই দর্শনেরই প্রতিফলন দেখা যায়। সরকার তাৎক্ষণিক রাজস্বের একটি অংশ ছাড় দিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতের বড় অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেছে।
অর্থবিলে আনা সংশোধনগুলো জনগণের মতামতের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় এতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলকের চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে ছাড় ও সুবিধার ঘোষণা থাকলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার, উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, উন্নয়ন ব্যয়ে অপচয়, দুর্নীতি রোধ ও ফাঁকফোকর বন্ধ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান নিশ্চিত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা প্রথমেই না বাড়লেও অর্থবিল পাসের দিন সেটি ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে সর্বনিম্ন সীমা ৪ লাখ টাকা করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ১ জুলাই থেকে কার্যকর হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের নবম বেতন কাঠামো। এর চাপ পড়তে পারে বেসরকারি ব্যক্তি ও খাতের ওপর। েসটি বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বহুল সমালোচিত কালো টাকা সাদা করার বিধানটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ এবং বণ্টন দলিল ও নামজারি নিবন্ধনের জন্য টিআইএন সনদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
এটি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে অনেক জমি বাজারমূল্যের পরিবর্তে মৌজা মূল্যে নিবন্ধিত হওয়ায় করদাতাদের জটিলতা থেকে রক্ষা করতেই এ প্রস্তাব আনা হয়। তবে জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার এটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বহু আলোচিত খুচরা দোকানির ওপর ভ্যাট চাপালেও তা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়। এ ছাড়া করপোরেট কর কমানো, পুঁজিবাজারে একগুচ্ছ প্রণোদনাসহ নানা সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত করনীতি, শিল্পনীতি ও বিনিয়োগ সুবিধার রূপরেখা দিয়ে সরকার বিনিয়োগকারীদের জানাতে চেয়েছে— নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
এ ছাড়া উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টায় কাঁচামালের শুল্ক কমানো, স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া এবং রপ্তানিমুখী খাতকে প্রণোদনা দেওয়া হয়। এতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার— মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, রাজনৈতিক সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও জনপ্রত্যাশা পূরণের চাপ থাকায় বাজেটে বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বললেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন। ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবে কার্যকর করতে না পারলে জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
এই বাজেটের মাধ্যমে সরকার রাজনৈতিকভাবেও একটি বার্তা দিয়েছে— তাদের প্রথম বাজেট কঠোর কর আরোপের নয়; বরং জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করার চেষ্টা। তবে বড় প্রশ্ন— রাজস্ব ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে। বাজেট প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়লে অর্থনীতির আকার বড়, করের আওতা সম্প্রসারিত এবং দীর্ঘ মেয়াদে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। এদিকে পুঁজিবাজারে একগুচ্ছ প্রণোদনা দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে পুরনো বিনিয়োগকারীরা আরও সুবিধা পাবেন। কিন্তু নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য সুখবর কমই আছে। এ ছাড়া বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরাসরি পরিকল্পনা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের জন্য আলাদা বড় কর-প্রণোদনা নেই। কৃষি খাতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বৃদ্ধির রূপরেখা স্পষ্ট নয়। আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে করনীতির সরাসরি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিফলিত হয়নি।




