বিটিএমএর সংবাদ সম্মেলন
কঠিন সংকটে বস্ত্র খাত
- ৭ বছরে বন্ধ ২৩৪ কারখানা
- উত্তরণে চার প্রস্তাব

সংগৃহীত ছবি
বহুমুখী সংকটে রয়েছে দেশের টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্প। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৬ শতাংশে পৌঁছানো, নগদ প্রণোদনা কমে যাওয়া, টাকার অবমূল্যায়ন এবং কাঁচামালের মূল্য অস্থিরতার কারণে খাতটি কঠিন সময় পার করছে।
শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এসব তথ্য জানান। তিনি বলেছেন, ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২৩৪টি টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং মিল। এখনো অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বেশিরভাগ কারখানা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়বে এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে চার দফা প্রস্তাব দিয়েছে বিটিএমএ। এগুলো হচ্ছে— দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পকে রক্ষায় ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত বহাল রাখা, করপোরেট করহার ১২ শতাংশ নির্ধারণ, পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারের (পিএসএফ) ওপর প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং রপ্তানি নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া।
বিটিএমএর সভাপতি বলেছেন, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশেরও বেশি আসে টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল খাত থেকে। এ শিল্পের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে দেশীয় প্রাইমারি টেক্সটাইল খাত, যা স্থানীয় মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তিনি জানান, বর্তমানে বিটিএমএর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮৭৮। স্পিনিং, উইভিং, ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং মিল নিয়ে গঠিত এ খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য সুতা ও কাপড় সরবরাহই নয়, ডেনিম, হোম টেক্সটাইল, টেরি টাওয়েলসহ বিভিন্ন খাতের চাহিদাও পূরণ করছে দেশীয় মিলগুলো। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
বিটিএমএর তথ্যমতে, দেশে সুতা আমদানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি ১০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংগঠনটির মতে, এই প্রবণতা দেশীয় স্পিনিং শিল্পের জন্য বড় হুমকি এবং ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকশিল্পকে আমদানিনির্ভর করে তুলতে পারে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে বিটিএমএ বলেছে, সরকার বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। রপ্তানি নগদ সহায়তার ওপর অগ্রিম আয়কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামানো, তুলা সরবরাহে উৎসে কর কমানো, সৌরবিদ্যুৎ খাতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশনকে সংগঠনটি স্বাগত জানিয়েছে।
তবে সংগঠনটির মতে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত সংশোধন না করলে সংকট আরও গভীর হবে। বর্তমানে প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে কার্যকর আয়কর হার ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, যেখানে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে করহার মাত্র ১২ শতাংশ। একই ভ্যালু চেইনের অংশ হওয়া সত্ত্বেও এই বৈষম্য বিনিয়োগ ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের করহার ১২ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বিটিএমএ।
এ ছাড়া বিশ্ববাজারে ম্যান-মেইড ফাইবার (এমএমএফ) ভিত্তিক পোশাকের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত তুলাভিত্তিক। এ অবস্থায় পিএসএফের ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হলে দেশীয় সুতা উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে বলে মনে করে সংগঠনটি।
শওকত আজিজ রাসেল বললেন, ‘আমরা কোনো অযৌক্তিক সুরক্ষা চাই না। আমরা চাই ন্যায্য প্রতিযোগিতা, স্থিতিশীল নীতি এবং দেশীয় শিল্পের জন্য টেকসই ব্যবসায়িক পরিবেশ। দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি শিল্প খাতকে রক্ষা করা নয়; এটি দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ শিল্পায়নকে রক্ষা করা।’




