আমদানিতে উদারতা রপ্তানিতে সতর্কতা

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডলারের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। এমন বাস্তবতায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক খাত নিয়ে নতুন এক সমীকরণ সাজাচ্ছে সরকার। যেটিকে এক ধরনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যই বলা চলে। যেখানে রপ্তানিতে সতর্কতা, আমদানিতে উদারতা এবং পুরো পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকছে প্রবাসী আয়। লক্ষ্য একটাই— ডলারের বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে অর্থনীতির চাকায় আবারও গতি দেওয়া।
সরকার একদিকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমিয়ে বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধরা হয়েছে বেশ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। একই সঙ্গে আমদানি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে শিল্প ও বিনিয়োগ কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ বৈদেশিক খাতের নতুন সমীকরণে ডলার সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রধান ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রবাসী আয়কে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূচক অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত হিসাবে পণ্য ও সেবা রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ ধরা হলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তা কমিয়ে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সরকারের পক্ষ থেকে একটি সতর্ক ও বাস্তবসম্মত বার্তা। কারণ গত কয়েক বছরে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে। সেই বাস্তবতায় এমন একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অর্জনযোগ্য বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে একই সময়ে আমদানি ও সেবা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দুই বছর ধরে ডলার সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ কার্যত আমদানি নিয়ন্ত্রণের নীতি অনুসরণ করেছে। এর ফলে শিল্প খাতে কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে চাপ তৈরি হয়। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারেনি, বিনিয়োগও ছিল মন্থর।
এ অবস্থায় আমদানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়ানোর অর্থ হচ্ছে উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমকে আবারও সচল করার চেষ্টা। শিল্পে কাঁচামালের সরবরাহ বাড়িয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যকে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানোই হবে মূল উদ্দেশ্য। সে হিসেবে আগামী অর্থবছরকে সংকোচনের নয়, বরং পুনরুদ্ধারের বছর হিসেবে দেখতে চাইছে সরকার। তবে এখানেই দেখা দিচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমদানি বাড়বে, কিন্তু রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমানো হচ্ছে— তাহলে অতিরিক্ত ডলার আসবে কোথা থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে রেমিট্যান্সের লক্ষ্যমাত্রায়। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত হিসাবে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে সেটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য রক্ষার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে প্রবাসী আয়কে।
গত এক বছরে বিনিময় হার আংশিক বাজারভিত্তিক করা, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের ফলে বৈধপথে রেমিট্যান্সপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সেই ইতিবাচক ধারার ওপর ভিত্তি করেই আগামী বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে শুধু প্রণোদনা যথেষ্ট হবে না। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য শ্রমবাজারে নতুন কর্মী পাঠানোর গতি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
এদিকে আগামী বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত লক্ষ্য হতে যাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত হিসাবে যেখানে রিজার্ভ প্রায় ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে, সেখানে আগামী অর্থবছরে সেটিকে ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ।
তবে রিজার্ভ বৃদ্ধি শুধু রপ্তানি বা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িত থাকে বৈদেশিক ঋণ, বাজেট সহায়তা, বিদেশি বিনিয়োগ, বহুপক্ষীয় সংস্থার অর্থছাড় এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়গুলোও। আগামী অর্থবছরেও বাংলাদেশকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ফলে রিজার্ভ ৫১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বড় আকারের বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি হবে।
অর্থ বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রিজার্ভ বাড়লে ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। এতে টাকার মান বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ার ঝুঁকি কমবে এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। ফলে ভোজ্যতেল, গম, জ্বালানি ও ওষুধের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপও কিছুটা কমতে পারে।
অন্যদিকে রেমিট্যান্স বাড়লে গ্রামের অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। এতে ভোগ ব্যয় বাড়বে, ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে এবং গ্রামীণ বাজারে নতুন গতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আমদানির লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি বাড়বে, যা উৎপাদন ও রপ্তানি খাতকে স্বস্তি দিতে পারে। পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও প্লাস্টিকশিল্পে উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
তবে এই পরিকল্পনার ঝুঁকিও কম নয়। আমদানি বাড়লে আবারও ডলারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। যদি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে টাকার অবমূল্যায়ন বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও আবার তীব্র হতে পারে।
সব মিলিয়ে আগামী বাজেটে বৈদেশিক
খাতের জন্য সরকার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে, তা একই সঙ্গে সাহসী ও চ্যালেঞ্জিং।
রপ্তানিতে সতর্কতা, আমদানিতে গতি এবং রেমিট্যান্সে বড় প্রত্যাশা— এই তিন স্তম্ভের ওপর
দাঁড়িয়ে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বাস্তবতার
পরীক্ষায় এই উচ্চাভিলাষী সমীকরণ কতটা সফল হয়।




