বাংলা কিউআর ভোগান্তি শঙ্কায়ও ব্যাপক সাড়া
- স্পর্শবিহীন হওয়ায় এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায় এবং জাল নোটের আশঙ্কাও থাকে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ এবং নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে চালু হয় বাংলা কিউআর। ঢাকঢোল পিটিয়ে এর যাত্রা। কিন্তু শুরুতে ব্যাপক হোঁচট খায় উদ্যোগটি। নেপথ্যে ছিল দুষ্প্রাপ্য, প্রতারণা, নিরাপত্তার শঙ্কা এবং গ্রাহক ভোগান্তি। এসব কাটিয়ে চলতি অর্থবছরে নগদবিহীন লেনদেন বাড়াতে ফের কোমর বেঁধে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন উদ্যোগের শুরুতে এবার ব্যাপক সাড়া পেয়েছে বাংলা কিউআর। সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা ধরে রাখতে অনেক ব্যাংক অ্যাপে এই সেবা যুক্ত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কার্ড নেটওয়ার্কের সঙ্গেও সমন্বয় করেছে। সবমিলে জুলাইয়ের দেড় হাজার কোটি লেনদেনের তুলনায় আগস্টে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বরে ১০ দিন বাকি থাকতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র আড়াই মাসে মোট লেনদেন ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ ২০২৩ সালে শুরু হয়ে গত জুন পর্যন্ত তিন বছরের বেশি সময় লেনদেন ৪ হাজার কোটি টাকায় ঘুরপাক খায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলা কিউআর হলো একীভূত কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা। আগে বিভিন্ন ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার জন্য আলাদা আলাদা কিউআর কোড থাকলেও এখন একটি কোড দিয়েই সব ধরনের পেমেন্ট গ্রহণ সম্ভব। তবে যাত্রাকালে বাংলা কিউআর একেবারে অপ্রতুল ছিল। নিরাপত্তা এবং নগদায়নে ছিল নানা জটিলতা। গ্রাহক ভোগান্তিও ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে এখন ছোট, মাঝারি ও বড়— সব ধরনের ব্যবসায়ী বাংলা কিউআরের আওতায় আসার সুযোগ রয়েছে। রেস্টুরেন্ট, মুদি দোকান, ফার্মেসি থেকে শুরু করে বড় শপিং সেন্টার— সব জায়গায় একই কিউআর কোড পাওয়া যায়। আর স্পর্শবিহীন হওয়ায় এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায় এবং জাল নোটের আশঙ্কাও থাকে না। পাশাপাশি ব্যাংকিং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে লেনদেন তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিতও থাকে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনকে আরও জনপ্রিয় ও গ্রাহকবান্ধব করার জন্য বিক্রেতাদের পেমেন্ট ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে পরিশোধ করা সব অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার হিসাবে জমা করতে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে ছোট বিক্রেতারা দ্রুত অর্থ পেলেও বড় বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় দুদিন পর অর্থ জমা হতো। এতে ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থগ্রহণে অনীহা তৈরি হতো। গত ১০ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃব্যাংক ‘ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি বা আইআরএফ শূন্য করার সিদ্ধান্ত ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের (পিএসও) জন্য বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেন চালু বাধ্যতামূলক করে। ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৫৬ লাখ লেনদেনে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। অথচ জুলাইয়ের শুরুতে দৈনিক লেনদেন ছিল ৩৫ কোটি টাকা। দুই মাসের ব্যবধানে দৈনিক লেনদেনের চার গুণ বেড়েছে। আর জুলাইয়ের শুরুতে বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্ট ছিল প্রায় ১৬ লাখ। আগস্টের শেষ নাগাদ তা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত পণ্য বা সেবা কেনাবেচার বাইরে কিউআর ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তর হলে ডিজিটাল লেনদেনের প্রকৃত চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি প্রতারণা, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের ঝুঁকির শঙ্কা রয়েছে। কেননা, গত ১ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত নগদের মাধ্যমে ৫ লাখ ৪০ হাজার ৭৬০টি বাংলা কিউআর ৩১৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে হয়েছে ৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকার লেনদেন, যা কিছু মার্চেন্টের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল কাদীর বলেছেন, ‘বাংলা কিউআর যেন অপব্যবহার না হয়, সেজন্য বাংলা কিউআরের জন্য যে নিয়মকানুন রয়েছে, এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।’
নগদের চেয়ারম্যান কায়জার আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, ‘সম্প্রতি বাংলা কিউআর লেনদেনে আন্তঃলেনদেন ফি (আইআরএফ) শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলা কিউআর উদ্যোগকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ ছাড়া সম্প্রতি কিউআর কোড ব্যবহার এবং লেনদেন হঠাৎ তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার তথ্য এসেছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।’
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘বাংলা কিউআরে লেনদেন বাড়াতে শুধু ফি মওকুফ বা নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম চাপিয়ে দিলেই হবে না। সব পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষিত না করা গেলে মানুষ নগদ লেনদেনের দিকেই বেশি ঝুঁকবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ‘মানুষের জীবন সহজ করতে ও নগদ টাকার লেনদেন কমাতে বাংলা কিউআর চালু করা হয়েছে। তবে এই সুবিধার কোনো অপব্যবহার হলে আইনের আওতায় শাস্তির সুযোগ আছে।’



