মূল্যস্ফীতি নিয়ে থাকছে সতর্কবার্তা

প্রতীকী ছবি
বাজারে গিয়ে থমকে দাঁড়ান গৃহিণী। মাসের শুরুতে যে চাল, তেল বা ডালের দাম দেখে হিসাব কষেছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে হিসাব ওলটপালট হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী বাড়তি খরচের কথা বলেন, পরিবহন খাত জ্বালানির অজুহাত দেয়, আর সাধারণ মানুষ খোঁজেন স্বস্তির কোনো খবর।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি আবারও উল্টোপথে হাঁটতে পারে। সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা, উচ্চ সুদহার এবং বাজার ব্যবস্থাপনার নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বহির্বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতি দেশের বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে থাকছে সতর্কবার্তা।
গত মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছানোর পর নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ অভ্যন্তরীণ কিছু অর্থনৈতিক সূচক ইতিবাচক সংকেত দিলেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজারে নতুন মূল্যচাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।
বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে। তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সে পূর্বাভাস বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তুত করা বাজেট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংঘাত ছয় মাস পর্যন্ত স্থায়ী হলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি অতিরিক্ত ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, বিশ্ব অর্থনীতি যখন দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সফল হতে শুরু করেছে, তখন নতুন ভূরাজনৈতিক সংকট সেই অর্জনকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল, এলএনজি, ভোজ্য তেল, গম এবং শিল্প কাঁচামালের দাম বাড়লে তার প্রভাব খুব দ্রুত দেশীয় বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
দেশে মূল্যস্ফীতি কমলেও ঝুঁকি কাটেনি
২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। একপর্যায়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে নীতি-সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। ফলে বাজারে অর্থ সরবরাহের গতি কমে আসে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধিও লক্ষ্যমাত্রার নিচে নেমে যায়।
ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও অর্থনীতির জন্য নতুন এক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ কমছে, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি অর্থনৈতিক কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অন্তত আরও কয়েক মাস নীতি-সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নামানো উচিত হবে না। এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
বাজেটই কি নতুন মূল্যচাপের উৎস?
আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আহরণ এবং প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব সংগ্রহেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ পথ হলো, ভ্যাট ও করের আওতা সম্প্রসারণ। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় এবং ভোক্তাপর্যায়ের পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বাজেট বাস্তবায়নে সরকার যদি বেশি মাত্রায় ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সুদের হার আরও বেড়ে যেতে পারে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ফলে আগামী বাজেট একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে।
রপ্তানি কমছে, আমদানি বাড়ছে
মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে বহিঃখাতে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়েছে।
রপ্তানি কমে যাওয়ার অর্থ হলো, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া। যদিও রেমিট্যান্স ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
রেমিট্যান্সপ্রবাহে ধাক্কা লাগলে এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে টাকার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হবে। আর বিনিময় হার দুর্বল হলে আমদানি করা প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা শেষপর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
আশার জায়গাও আছে
তবে পুরো চিত্রটি নেতিবাচক নয়। বাজেট বক্তব্যে বলা হয়েছে, দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন স্থিতিশীল রয়েছে। আমন ও বোরো ধানের উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি খাদ্য মজুদও সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যও উদ্বৃত্ত অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও মনে করেন, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা গেলে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।
তবে সে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন ধাক্কা এড়াতে হবে এবং সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হবে।
সামনের বছরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বিশ্লেষণে স্পষ্ট করা হয়েছে, দেশের মূল্যস্ফীতি এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিময় হার এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ফল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি করতে চায়, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতিও বজায় রাখতে হচ্ছে। এ দুই বিপরীতমুখী লক্ষ্য বাস্তবায়নই হবে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বলছে, মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে কিছুটা কমলেও ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে এবং বাজেট বাস্তবায়নের চাপ সৃষ্টি হলে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।




